বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ একীভূতকরণের পথে এগোচ্ছে দুই দেশের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তানভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক আলফালাহ লিমিটেড তাদের বাংলাদেশে পরিচালিত কার্যক্রম বিক্রির প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির ৭৮তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) শেয়ারহোল্ডাররা প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ মার্কিন ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮৪ কোটি ২৫ লাখ টাকায়—বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম বিক্রির প্রস্তাবে সম্মতি দেন। এই তথ্য পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে প্রকাশিত কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে।
গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংক আলফালাহ তাদের বাংলাদেশ অপারেশন ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে। তবে চূড়ান্ত লেনদেন মূল্য একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সময় সম্পদ ও দায়ের সমন্বয়ের ভিত্তিতে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ধরনের লেনদেনে সাধারণত সম্পদের গুণগত মান, ঋণের ঝুঁকি এবং দায়সমূহের কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হলেও বাজারে ইতোমধ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ব্যাংক আলফালাহ পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক, যা ২০০টিরও বেশি শহরে ১,০২৪টির বেশি শাখার মাধ্যমে সেবা দিয়ে আসছে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে তাদের উপস্থিতি পুনর্বিন্যাস করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আফগানিস্তানে তাদের ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক এশিয়া দেশের অন্যতম উদীয়মান বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে এটি হবে তাদের তৃতীয় বিদেশি ব্যাংকের স্থানীয় কার্যক্রম গ্রহণের ঘটনা। এর আগে তারা কানাডাভিত্তিক নোভা স্কোটিয়া এবং পাকিস্তানের মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের বাংলাদেশ শাখা সফলভাবে অধিগ্রহণ করেছিল।
২০২৫ সালের ২৮ মে ব্যাংক আলফালাহ ও ব্যাংক এশিয়ার মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ব্যাংক এশিয়া তাদের শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য আগামী ১২ এপ্রিল একটি বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করেছে, যেখানে এই অধিগ্রহণ প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা হবে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগে শ্রীলঙ্কার হাটন ন্যাশনাল ব্যাংকও ব্যাংক আলফালাহর বাংলাদেশ কার্যক্রম অধিগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। এমনকি তারা প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের অনুমতিও পেয়েছিল দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যাংক এশিয়াই এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি, বিদেশি ব্যাংকের স্থানীয় কার্যক্রম দেশীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে আসা দেশের আর্থিক খাতকে আরও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করতে পারে।
সার্বিকভাবে, এই চুক্তি শুধু একটি ব্যবসায়িক লেনদেন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন ও শক্তিশালীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

