দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতে কর্মপরিবেশ ও শ্রমঘণ্টা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কর্মীদের সাপ্তাহিক ছুটি নিশ্চিত করতে প্রায় ৯৫০টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) বা এনজিওকে নির্দেশনা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। সম্প্রতি ৯৪৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো চিঠিতে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নির্ধারিত ছুটির দিনে কর্মীদের দিয়ে কোনো ধরনের কাজ করানো যাবে না এবং অফিস সময়সূচি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এমআরএর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার ও শনিবার নির্ধারিত থাকলেও অনেক এমএফআইয়ে এই নিয়ম বাস্তবে মানা হচ্ছে না। অফিস সময় শেষ হওয়ার পর কিংবা ছুটির দিনেও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ঋণের কিস্তি আদায়সহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত রাখা হচ্ছে। এতে কর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এই প্রেক্ষাপটে এমআরএ পুনরায় নির্দেশনা দিয়ে জানিয়েছে, রোববার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার নির্ধারিত নতুন সময়সূচি অনুযায়ী আপাতত অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সীমিত রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এমএফআইয়ের সংখ্যা ৬৭০টি এবং অস্থায়ী অনুমোদনপ্রাপ্ত রয়েছে আরও ২৭৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার। এত বড় কর্মীবাহিনীর জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে এমআরএ।
এমআরএর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এটি নতুন কোনো নির্দেশনা নয়; বরং আগের নির্দেশনাগুলোই আবারও কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে চললেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। কর্মীদেরও ব্যক্তিগত জীবন আছে, সেটি বিবেচনায় রেখেই আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছি।”
তবে এই নির্দেশনার বিপরীতে ভিন্নমত দিয়েছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। তাদের মতে, ক্ষুদ্রঋণ খাতের কার্যক্রম মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, যেখানে গ্রাহকদের সময়সূচি নির্দিষ্ট নয়। হাওর, চর বা উপকূলীয় অঞ্চলের গ্রাহকেরা ভোরবেলা বা সন্ধ্যার পর লেনদেন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে কঠোর ৯টা-৫টার অফিস সময় এই খাতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সিডিএফ আরও উল্লেখ করেছে, মাঠকর্মীদের অনেক সময় দিনে একাধিকবার গ্রাহকদের কাছে যেতে হয় এবং গ্রাহকের সুবিধা অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তাই সন্ধ্যার পর কিস্তি আদায় বন্ধ করে দিলে ঋণ আদায়ের হার কমে যেতে পারে, যা পুরো অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ধীর করে দিতে পারে।
সংগঠনটি একটি মধ্যপন্থার প্রস্তাবও দিয়েছে। তাদের মতে, ধাপে ধাপে সাপ্তাহিক দুই দিন ছুটি চালু করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে মাসে দুইটি শুক্রবার ও শনিবার বন্ধ রেখে পরে পুরোপুরি বাস্তবায়নের দিকে যাওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মঘণ্টা নির্ধারণের সুযোগ রাখার পক্ষেও মত দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে কর্মীদের অধিকার ও কাজের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ খাতের কার্যক্রমের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ এই খাত দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সামগ্রিকভাবে, এমআরএর এই নির্দেশনা শ্রমিক কল্যাণে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং খাতভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

