দেশের স্থবির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো, উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত সমন্বিত অর্থায়ন প্যাকেজ বাস্তবায়নে আরও ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে এসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর আগে প্রথম ধাপে ৭টি ব্যাংক চুক্তিতে যুক্ত হওয়ায় ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিল বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭টিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের তুলনামূলক উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের চাপ দেশের অর্থনীতির ওপর বহুমুখী প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্যকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করাই এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বৃহস্পতিবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে দ্বিতীয় ধাপের অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ।
৬০ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত অর্থায়ন প্যাকেজ
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমকে গতিশীল করার উদ্দেশ্যে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত অর্থায়ন প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
এই প্যাকেজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যকে অর্থনীতির অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে সাশ্রয়ী অর্থায়নে রূপান্তর করা। মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রাক্-অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে।
অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বাড়তে পারে, অন্যদিকে উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে বাজারে পণ্যের ঘাটতি কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে কৃষি, সিএমএসএমই, রপ্তানি ও কর্মসংস্থাননির্ভর খাতে অর্থায়ন বাড়ানো হলে এর বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কোন খাতে যাচ্ছে ৪১ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিল পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে ব্যবহৃত হবে।
বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক্-অর্থায়ন স্কিমে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বা কার্যক্রমে সংকটে থাকা শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এ অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পল্লি অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। কৃষি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি শুধু খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সিএমএসএমই খাতে চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়নে রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চলতি মূলধনের সংকট দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। ব্যাংকঋণের সুযোগ বাড়লে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র বা কৃষি হাব গঠনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ খাতের পুনঃঅর্থায়নে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে প্যাকেজের অবশিষ্ট ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে ১০টি বিশেষ কর্মসূচির আওতায় অর্থায়ন করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপে যে ১০ ব্যাংক যুক্ত হলো
দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষরকারী ব্যাংকগুলো হলো—অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক এবং উত্তরা ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে রিচার্জ ও ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিকস ডিপার্টমেন্টের পরিচালক মো. আবদুল মান্নান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এর আগে ২০ আগস্ট প্রথম ধাপে ৭টি ব্যাংকের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রথম ধাপে অংশ নেওয়া ব্যাংকগুলো হলো—সোনালী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ইস্টার্ন ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক।
ফলে দুই ধাপে মোট ১৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশেষ অর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
উদ্বৃত্ত তারল্য উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের ওপর জোর
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য যদি সঠিকভাবে দেশের উৎপাদনশীল ও অগ্রাধিকার খাতে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রবাহিত করা যায়, তাহলে তা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা সম্ভব। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সেই ঋণ কোন খাতে এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্যাকেজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অর্থায়নকে সরাসরি উৎপাদন, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানি এবং বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের মতো খাতের সঙ্গে যুক্ত করা।
বিশেষ করে সিএমএসএমই খাতে চলতি মূলধন সরবরাহ বাড়লে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় কার্যক্রম শুরু করতে পারলে নতুন করে শ্রমের চাহিদা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে সহায়ক হতে পারে। রপ্তানি বহুমুখীকরণে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ দেশের রপ্তানি খাতকে প্রচলিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন পণ্য ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারে।
তবে এই অর্থায়ন প্যাকেজের কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত করতে ঋণের যথাযথ ব্যবহার, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ পৌঁছানো, ঋণের অপব্যবহার রোধ এবং পুনঃঅর্থায়নের অর্থ সময়মতো বিতরণের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলোর তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের তারল্যকে অর্থনীতির বাস্তব উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানো সম্ভব হলে তা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. সারোয়ার হোসেন, নির্বাহী পরিচালক মো. এনামুল করিম খান ও মো. আবুল বাসারসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

