দেশীয় মালিকানার ব্যাংক খাতে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করেছে পূবালী ব্যাংক। প্রথমবারের মতো এক হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করে ব্যাংকটি প্রবেশ করেছে দেশের শীর্ষ লাভজনক ব্যাংকগুলোর কাতারে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
এতদিন দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে এই উচ্চ মুনাফার ক্লাবে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংক। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক গত বছর রেকর্ড ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা মুনাফা করে শীর্ষে অবস্থান ধরে রাখে, আর সিটি ব্যাংকের মুনাফা ছিল ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। সেই তালিকায় এবার নতুন সংযোজন পূবালী ব্যাংক, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সাম্প্রতিক সভায় অনুমোদিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে পূবালী ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩১১ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। ২০২৪ সালে যেখানে মুনাফা ছিল ৭৮০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা লাফিয়ে হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর মাধ্যমে।
মুনাফার পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আকর্ষণীয় লভ্যাংশও ঘোষণা করেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ অর্থবছরের জন্য মোট ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ এবং ১৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার অন্তর্ভুক্ত। আগের বছরের তুলনায় লভ্যাংশের হার ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুদ আয় বৃদ্ধি পেলেও আমানতের ওপর সুদ ব্যয় দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ায় নিট সুদ আয় কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালে ঋণের সুদ থেকে আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। তবে আমানতের সুদ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকায়, যা প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিট সুদ আয় কমে ৯৫৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যেখানে ২০২৪ সালে এটি ছিল ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা।
তবে সুদ আয়ের এই চাপকে দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিয়েছে ব্যাংকটির বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয় খাত। সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটির আয় বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭২ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি কমিশন, ব্রোকারেজ এবং অন্যান্য সেবাভিত্তিক আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মোট পরিচালন মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়।
পরিচালন ব্যয়, কর এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশনিং বাদ দেওয়ার পর চূড়ান্ত নিট মুনাফা ১ হাজার ৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্জন ব্যাংকটির বহুমুখী আয় উৎস ও কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, সুশাসন ও কম খেলাপি ঋণের হারই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২.২ শতাংশ, যা খাতের গড়ের তুলনায় বেশ কম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্যাংকের অধিকাংশ সম্পদই আয়-উৎপাদনক্ষম হওয়ায় ধারাবাহিকভাবে আয় বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পূবালী ব্যাংকের এই সাফল্য দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সুদনির্ভর আয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও সেবামূলক আয় বাড়ানোর কৌশল ভবিষ্যতে ব্যাংকটির প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে এটি অন্যান্য ব্যাংকের জন্যও একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে, যেখানে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও আয় বৈচিত্র্যই হতে পারে টেকসই মুনাফার চাবিকাঠি।

