আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধিকে সামনে রেখেই এই বৃহৎ বাজেট কাঠামো চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী–এর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের দল বুধবার রাতে সচিবালয়ে আগামী বাজেটের সামগ্রিক রূপরেখা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর কাছে উপস্থাপন করে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাজেটের মূল দিকনির্দেশনায় সম্মতি দিয়েছেন এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে জোর
সরকারের নতুন বাজেটে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ভাতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে। চলতি অর্থবছরে শুরু হওয়া সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ কর্মসূচিকে আগামী অর্থবছরে আরও কাঠামোগত ও সুসংহত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারায় আনার উদ্যোগ
বাজেট বৈঠকে “সৃজনশীল অর্থনীতি” বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, সংস্কৃতি, মিডিয়া, ডিজিটাল কনটেন্ট, ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং ও উদ্ভাবনভিত্তিক খাতকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে এসব পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দিতে এই খাত আগামী বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজস্ব আয় ও ঘাটতির বড় লক্ষ্য
সূত্রগুলো জানায়, আগামী বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি ধরা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ খাতে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। আগামী অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভর্তুকিতে বড় বরাদ্দের পরিকল্পনা
বর্ধিত মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্য সহায়তা খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বজায় রাখার পরিকল্পনা করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ, এলএনজি, সার, ওএমএস এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি রাখা হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে এখনও বড় ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ
আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে। অন্যদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস তুলনামূলক কম। বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক চাপের ভারসাম্য
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন বাজেট প্রণয়নে সরকারকে একদিকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর শর্ত ও আর্থিক সংস্কারের চাপ—দুই দিকই সামাল দিতে হচ্ছে।
রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংকিং ও ভর্তুকি খাতে সংস্কার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রত্যাশা থাকলেও সরকার একই সঙ্গে জনমুখী ব্যয় বাড়াতে চায়। ফলে এবারের বাজেটকে অনেকেই “ভারসাম্যের বাজেট” হিসেবে দেখছেন।
জাতীয় সংসদে আগামী ঈদের পর ১১ জুন নতুন অর্থবছরের এই বাজেট উপস্থাপন করা হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

