জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি বিকল্প বন্দর, পাইপলাইন, মজুত ও সরবরাহকারী খুঁজছে বিশ্ব
হরমুজ প্রণালির সংকটকে এতদিন পর্যন্ত মূলত জ্বালানি সরবরাহের একটি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও পরিস্থিতি এখন সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, খাদ্য নিরাপত্তা, বীমা, শিল্প উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামোকেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—কম খরচে পণ্য সরবরাহ করাই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যের একমাত্র লক্ষ্য থাকবে না। বরং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা, বিকল্প পথ, কৌশলগত মজুত এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও ব্যবসা ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে চলে আসছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (UNCTAD) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য তেলজাত পণ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ যায়। একই পথ দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG), LPG ও সারও পরিবহন করা হয়। ফলে এই একটি নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তার প্রভাব দ্রুতই বিশ্ব অর্থনীতির অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক।
একক নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে
হরমুজ সংকটের ফলে সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে কোনো একটি দেশ, বন্দর, পাইপলাইন বা নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো যায়।
গত কয়েক বছরে কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, লোহিত সাগরের অস্থিরতা এবং এখন হরমুজ সংকট—একটির পর একটি ঘটনা দেখিয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা কতটা আন্তঃনির্ভরশীল এবং একই সঙ্গে কতটা ভঙ্গুর।
একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কারণ হয়তো অন্য একটি মহাদেশে। একটি জাহাজের পথ পরিবর্তনের কারণে বাড়তে পারে কয়েক হাজার কিলোমিটার যাত্রা। আর সেই বাড়তি জ্বালানি, সময়, বীমা ও পরিবহন ব্যয়ের শেষ বোঝা গিয়ে পড়ে আমদানিকারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর।
UNCTAD-এর বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, হরমুজ সংকটে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। এর সঙ্গে বেড়েছে ট্যাংকারের ভাড়া, সামুদ্রিক জ্বালানির দাম এবং যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম।
এ কারণে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো শুধু ‘just-in-time’ বা সর্বনিম্ন মজুতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়িক মডেলের পরিবর্তে ‘just-in-case’ কৌশলের দিকে আরও বেশি যেতে পারে। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় যাতে সরবরাহ বন্ধ না হয়, সে জন্য বাড়তি মজুত, একাধিক সরবরাহকারী এবং বিকল্প পরিবহনপথ রাখা হতে পারে নতুন স্বাভাবিকতা।
তেলের বাজারে বিকল্প পথের গুরুত্ব
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে তেল ও গ্যাসের বাজারে। তবে সংকটের মধ্যেই উৎপাদক ও আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার বাস্তব উদাহরণও পেয়েছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য পাইপলাইন ও বিকল্প বন্দর ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প অবকাঠামো হিসেবে সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও সৌদি আরব সীমিত পরিসরে হরমুজের বাইরে বিকল্প রুট ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ যাত্রাপথের কারণে বিকল্প রুট সবসময় মূল পথের পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না।
এখানেই সংকটের বড় শিক্ষা—বিকল্প অবকাঠামো থাকা এবং সেটিকে বড় পরিসরে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। তাই ভবিষ্যতের বিনিয়োগে শুধু পাইপলাইন বা বন্দর নির্মাণ নয়, সেই অবকাঠামোর সক্ষমতা, সংযোগ, নিরাপত্তা ও দ্রুত ব্যবহারের প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এশিয়ার জ্বালানি কৌশলে পরিবর্তন
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে বড় ভোক্তাদের মধ্যে রয়েছে এশিয়ার দেশগুলো। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে LNG-এর ক্ষেত্রে হরমুজের গুরুত্ব আরও বেশি। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের LNG বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে এবং এর বড় অংশের গন্তব্য ছিল এশিয়া।
ফলে সংকটের সময় এশীয় আমদানিকারকদের বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের আগ্রহ বেড়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে কাতার থেকে LNG সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ওমান, যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিকল্প LNG সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে এশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি থেকে সরে যাবে। বরং ভবিষ্যতের কৌশল হতে পারে—মধ্যপ্রাচ্য থাকবে গুরুত্বপূর্ণ উৎস, তবে তার পাশাপাশি একাধিক ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
সংকট শুধু তেলের নয়
হরমুজ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর প্রভাব জ্বালানি বাজারের বাইরে খাদ্য ও শিল্পপণ্যের বাজারেও পৌঁছেছে।
এই প্রণালি দিয়ে শুধু তেল ও LNG নয়, বিপুল পরিমাণ সারও পরিবহন করা হয়। UNCTAD-এর হিসাবে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই করিডোরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের ডিজেল, সেচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। সার আমদানির ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়ে। এরপর সেই বাড়তি খরচ খাদ্যপণ্যের বাজারে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ একটি সামুদ্রিক সংকট শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। এসব দেশের অনেকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত সীমিত, ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি এবং আমদানিনির্ভরতা তুলনামূলকভাবে বেশি।
বীমা ব্যয়ও বড় ঝুঁকি
হরমুজ সংকটে জাহাজ চলাচলের খরচের পাশাপাশি সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে যুদ্ধঝুঁকি বীমার ব্যয়।
সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ ও আশপাশের সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বীমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ধার্য করেছে। কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম জাহাজের মূল্যের ওপর কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে জাহাজ চলাচল শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, একই সঙ্গে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত একাধিক স্তর পেরিয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায়। একটি তেলবাহী জাহাজের বীমা বাড়লে জ্বালানির আমদানি ব্যয় বাড়ে; জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে; পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, পোশাক ও শিল্পপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়।
ফলে হরমুজ সংকটকে এখন শুধু ‘তেলের সংকট’ হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক প্রভাবের বড় অংশই বাদ পড়ে যাবে।
দীর্ঘ হচ্ছে বিকল্প সমুদ্রপথ
হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় জাহাজগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিকল্প পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
দীর্ঘ যাত্রার অর্থ হলো বেশি জ্বালানি খরচ, বেশি ক্রু ব্যয়, বেশি বীমা, বেশি জাহাজের প্রয়োজন এবং পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময়। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ‘lead time’ বা পণ্য সরবরাহের সময়ও বাড়ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো—একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনের জন্য বেশি জাহাজ ও বেশি কার্যকরী মূলধন প্রয়োজন হবে। ফলে পরিবহন সক্ষমতা কমে গেলে শুধু জাহাজভাড়াই নয়, বন্দর ও গুদাম ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক শিপিং পরিস্থিতি দেখিয়েছে, যুদ্ধ ও জলবায়ুজনিত কারণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একসঙ্গে বিঘ্নিত হলে পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়তে পারে।
ব্যবসায় নতুন কৌশল: ‘এক উৎস নয়, একাধিক উৎস’
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সম্ভবত করপোরেট সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় পড়বে।
আগে অনেক কোম্পানি কম খরচের কারণে একটি দেশ বা কয়েকটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করত। এখন সেই মডেল বদলাতে পারে। একটি কোম্পানি হয়তো একই কাঁচামালের জন্য চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইউরোপে আলাদা সরবরাহকারী রাখবে। একইভাবে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোও একাধিক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে পারে।
গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও জ্বালানির ক্ষেত্রে কৌশলগত মজুত বাড়ানো হতে পারে। এতে স্বাভাবিক সময়ে ব্যবসার খরচ কিছুটা বাড়বে, কিন্তু সংকটের সময়ে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের বাণিজ্যে ‘সবচেয়ে সস্তা পথ’ নয়, বরং ‘সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ’ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশও বাইরে নয়
হরমুজ প্রণালির সংকট বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরাসরি হরমুজের ওপর নির্ভরশীল না হলেও দেশের জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, সার, খাদ্যপণ্য এবং পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের যোগসূত্র রয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেল ও LNG-এর দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজভাড়া ও বীমা ব্যয় বাড়লে পণ্য আমদানির মোট ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এ ধরনের বহুমাত্রিক ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই হরমুজ সংকট বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, কৌশলগত মজুত, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিকল্প সরবরাহকারী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে LNG, জ্বালানি তেল, সার ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত একক-নির্ভরতা কমানো জরুরি।
কোভিডের পর দ্বিতীয় বড় শিক্ষা
কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্ব প্রথম বড় পরিসরে বুঝেছিল, অত্যন্ত দক্ষ কিন্তু অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত সরবরাহব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তখন কারখানা বন্ধ, কনটেইনার সংকট, বন্দর জট ও পরিবহন ব্যাঘাত একসঙ্গে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
হরমুজ সংকট সেই শিক্ষাকে আরও গভীর করছে।
তবে সরবরাহব্যবস্থা রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। একটি নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, নতুন বন্দর তৈরি, LNG টার্মিনাল স্থাপন কিংবা নতুন সরবরাহকারীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে সময় ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এ কারণে সংকট শেষ হওয়ার পরও এর প্রভাব পুরোপুরি মিলিয়ে যাবে না। UNCTAD-ও সতর্ক করেছে, হরমুজে স্বাভাবিকতা ফিরলেও জ্বালানি বাজারের তুলনায় খাদ্য, পরিবহন, ব্যবসা ও সরকারি অর্থব্যবস্থায় সংকটের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব কমবে না, বদলাবে নির্ভরতার ধরন
হরমুজ সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তার গুরুত্ব হারাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্য আগামী বহু বছর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে থাকবে।
পরিবর্তনটি হতে পারে নির্ভরতার কাঠামোয়।
একটি নির্দিষ্ট প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহনের পরিবর্তে পাইপলাইন, বিকল্প বন্দর, স্থলপথ, বিভিন্ন উৎপাদন অঞ্চল এবং বিভিন্ন সমুদ্রপথকে সমন্বিত করে একটি বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা হতে পারে।
অন্যদিকে আমদানিকারক দেশগুলোও একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্পট মার্কেট, কৌশলগত মজুত এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের সমন্বয় করতে পারে।
ভবিষ্যতের বাণিজ্যে ‘স্থিতিস্থাপকতা’র মূল্য বাড়বে
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত তেলের দামের ওঠানামা নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতির একটি মৌলিক পরিবর্তন।
দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল দর্শন ছিল—যেখানে উৎপাদন সবচেয়ে সস্তা, সেখানেই উৎপাদন হবে এবং সবচেয়ে কম খরচের পথ দিয়ে পণ্য পরিবহন করা হবে।
কিন্তু মহামারি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামুদ্রিক নৌপথের অস্থিরতা সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—সবচেয়ে সস্তা সরবরাহব্যবস্থা কোনটি নয়; বরং সংকটের মধ্যেও কোন সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব।
এই পরিবর্তনের অর্থ হলো, আগামী দিনের বাণিজ্যে ‘resilience premium’ বা স্থিতিস্থাপকতার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতেও কোম্পানি ও সরকার প্রস্তুত থাকবে।
একটি কোম্পানি হয়তো একটু বেশি খরচ করবে, কিন্তু বিনিময়ে একাধিক সরবরাহকারী রাখবে। একটি দেশ হয়তো বেশি অর্থ ব্যয় করে কৌশলগত জ্বালানি মজুত করবে। একটি বন্দর হয়তো অতিরিক্ত অবকাঠামো তৈরি করবে, যদিও তা প্রতিদিন পুরো সক্ষমতায় ব্যবহার হবে না।
কারণ সংকটের সময় সেই অতিরিক্ত সক্ষমতাই হয়ে উঠতে পারে অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা তাই কেবল একটি ভূরাজনৈতিক সংকট নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি কাঠামোগত পরীক্ষা। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্য শুধু কম খরচ, দ্রুত সরবরাহ ও সর্বোচ্চ দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না। নিরাপত্তা, বিকল্প ব্যবস্থা, মজুত, অবকাঠামো এবং ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সংকট যত দীর্ঘ হবে, এই পরিবর্তন তত গভীর হতে পারে। আর সংকট দ্রুত কেটে গেলেও এর শিক্ষা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি—বিশ্ব অর্থনীতি আর কোনো একটি প্রণালি, একটি দেশ কিংবা একটি সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে থাকতে চাইবে না।

