দেশের পরিবহন খাতকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্কুল শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য বৈদ্যুতিক বাস (ইলেকট্রিক বাস) আমদানিতে সম্পূর্ণ শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট সাতটি সংগঠনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট বৈঠকে তিনি এ তথ্য জানান। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করতে চাই। নতুন ও পরিবেশবান্ধব যানবাহন রাস্তায় আনতে সর্বোচ্চ নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্কুলবাসে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করবে না, বরং বায়ুদূষণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খরচও কমে আসবে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা) জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে গাড়ির নিবন্ধন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে তারা সম্পূরক শুল্ক হ্রাসের দাবি জানায়, যাতে বাজারে গাড়ির চাহিদা পুনরুদ্ধার হয়।
অন্যদিকে, জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিরা তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্যাংকলরি আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর অ্যান্ড এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এ বিষয়ে জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। এনবিআর চেয়ারম্যান এ প্রস্তাব বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
মোটরসাইকেল শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠনও আলোচনায় সক্রিয় ছিল। বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন মোটরসাইকেলে সিএনজি ব্যবহারের অনুমতি চায়। তবে এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান স্পষ্ট করে বলেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট রয়েছে এবং এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তাই বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁকার পরামর্শ দেন তিনি।
এভিয়েশন খাত থেকেও কর সংক্রান্ত উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ জানায়, জেট ফুয়েলের ওপর করের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অপারেশনাল ব্যয় বাড়ছে। তারা আগের করহার বহাল রাখার দাবি জানালেও এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ায় এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত।
তিনি বলেন, “বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য চার লাখ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী রাখতে হবে।”
সার্বিকভাবে, আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে পরিবহন ও জ্বালানি খাতে একদিকে যেমন কর সুবিধা ও প্রণোদনার আলোচনা চলছে, অন্যদিকে রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে স্কুলে বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার পথ সুগম করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

