বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে থাকা অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্কিম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পেনশনার সঞ্চয়পত্র। সরকারি এই বিনিয়োগপত্রে মেয়াদ পূর্ণ হলে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়, যা বিদ্যমান অনেক ব্যাংক আমানতের চেয়ে বেশি। অবসর-পরবর্তী নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা দিতে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই এই স্কিমে তুলনামূলক উচ্চ মুনাফা হার নির্ধারণ করেছে।
২০০৪ সালে চালু হওয়া এই স্কিম দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর মুনাফা উত্তোলনের সুবিধা থাকায় এটি অবসরভোগীদের মাসিক বা ত্রৈমাসিক ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আয়ের উৎস তৈরি করে।
জাতীয় সঞ্চয়পত্রের চার স্কিম
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে—
- পরিবার সঞ্চয়পত্র
- পেনশনার সঞ্চয়পত্র
- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র
- তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র
পরিবার সঞ্চয়পত্র ছাড়া বাকি তিন স্কিমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই বিনিয়োগ করতে পারে। তবে পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিশেষভাবে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রণীত।
কত টাকায় কেনা যায়
পেনশনার সঞ্চয়পত্র ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত মূল্যমানে কেনা যায়। প্রচলিত মূল্যমানগুলো হলো—৫০ হাজার, ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকা।
কোথায় পাওয়া যায়
জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো কার্যালয়, অনুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে পেনশনার সঞ্চয়পত্র কেনা ও ভাঙানো যায়।
কারা কিনতে পারবেন
এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন—
- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী
- সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি
- সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য
- মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশনভোগী স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান
মেয়াদ ও মুনাফা হার
পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ পূর্ণ হলে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যায়। এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
তবে প্রথম বছর শেষে নগদায়ন করলে তুলনামূলক কম মুনাফা পাওয়া যায়। মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙালে অতিরিক্ত পরিশোধিত মুনাফা মূল টাকা থেকে সমন্বয় করে অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করা হয়।
উৎসে কর সুবিধা
পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর কোনো উৎসে কর কাটা হয় না। পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ হলে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রযোজ্য হয়। এই কর সুবিধা অনেক অবসরপ্রাপ্ত বিনিয়োগকারীর জন্য বাড়তি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে।
সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা
গ্র্যাচুইটি ও ভবিষ্য তহবিলের অর্থ মিলিয়ে একজন ব্যক্তি একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন।
ত্রৈমাসিক মুনাফা উত্তোলনের সুবিধা
এই স্কিমের অন্যতম আকর্ষণ হলো—প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা উত্তোলনের সুযোগ। ফলে অবসরপ্রাপ্তরা নিয়মিত নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারেন। পাশাপাশি নমিনি নিয়োগের সুবিধা রয়েছে। ক্রেতার মৃত্যু হলে নমিনি চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে অথবা মেয়াদ শেষে সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করতে পারেন।
কেন জনপ্রিয় এই স্কিম
উচ্চ মুনাফা, কর সুবিধা, ত্রৈমাসিক আয়ের নিশ্চয়তা এবং সরকারি নিরাপত্তা—এই চার বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে পেনশনার সঞ্চয়পত্র এখনো অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকদের অন্যতম ভরসার জায়গা। মূল্যস্ফীতির চাপে স্থির আয়ের মানুষদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতেও যদি সরকার সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে, তবে পেনশনার সঞ্চয়পত্র অবসরভোগীদের আর্থিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে থাকবে।

