বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ককে তুলনামূলকভাবে সহনীয় হিসেবে দেখছে সরকার। রপ্তানি সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, স্থলবন্দর সচল এবং শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যনীতির আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বিদ্যমান সাধারণ শুল্কের বাইরে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এই হার কম হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ এখনো যথেষ্ট রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শনিবার দুপুরে সিলেট মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কনীতি শুধু বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারে এ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যেসব দেশের ওপর তুলনামূলকভাবে কম হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। ফলে এই পরিস্থিতিকে শুধু ঝুঁকি হিসেবে না দেখে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগাতে হবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্ব
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন, শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন এবং বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্লাস্টিক পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সরকারের জন্য এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে বিদ্যমান বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ কমানো, পণ্যের মান উন্নত করা এবং বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আগ্রহ
সম্প্রতি ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের অবকাঠামো ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিনিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে দুটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব টাস্কফোর্স সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্প চিহ্নিত করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলবন্দরগুলো পুরোপুরি কার্যকর করার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
মন্ত্রী বলেন, দেশের সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলো দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থলবন্দর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে শুধু ভারত নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
মার্কিন বিনিয়োগেও আগ্রহ
বাংলাদেশে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের বিনিয়োগ আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহায়ক করতে মার্কিন প্রতিনিধিদল কিছু প্রস্তাব ও পরামর্শ দিয়েছে। সরকার এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু নীতিগত সুবিধা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। দ্রুত অনুমোদন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ মানবসম্পদ, কর ও শুল্ক ব্যবস্থার পূর্বানুমেয়তা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাণিজ্যঘাটতি নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা
বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি ২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির তুলনায় বেশি। বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রেই আমদানির পরিমাণ রপ্তানির চেয়ে বেশি হওয়ায় এটিকে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে তিনি রপ্তানি বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়লে অর্থনীতির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হবে এবং এর সঙ্গে আমদানির চাহিদাও বাড়তে পারে।
ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশটির আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে এই পরিমাণ প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’
সিলেট মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নগরের অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানান মন্ত্রী। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যেই এ সভার আয়োজন করা হয়।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইন অনুযায়ী কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সিএমএসএমই খাতকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য
এর আগে শনিবার সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন—বিসিকের উদ্যোগে একটি ডিসপ্লে ও সেলস সেন্টার উদ্বোধন করেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী।
এ সময় তিনি বলেন, বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতিতে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প—অর্থাৎ সিএমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩৪ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য আগামী দিনে এ অবদান ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।
দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে অর্থায়ন, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগের আওতায় আনা গেলে এ খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে শিল্পে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা
শিল্প খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সৌরশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব। পর্যাপ্ত স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দিনের বাইরে সন্ধ্যার পিক আওয়ারেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্প খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ ও লোডশেডিংয়ের সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিসিক-৩ প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন
দিনের শেষ পর্যায়ে মন্ত্রী সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শাহপরান (রহ.) বাইপাস এলাকায় প্রস্তাবিত বিসিক-৩ শিল্পনগরীর জমি পরিদর্শন করেন। সম্ভাব্য শিল্পাঞ্চলটি বাস্তবায়িত হলে সিলেট অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনায় রপ্তানি সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সিএমএসএমই খাতের সম্প্রসারণ, স্থলবন্দর ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার—এই কয়েকটি বিষয় এখন পরস্পরসম্পর্কিত। বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়লেও এসব খাতে কার্যকর সংস্কার ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

