চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আশঙ্কার তুলনায় অনেক কম বেড়েছে। সংঘাত শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার, এমনকি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা করেছিলেন অনেক বিশ্লেষক। তবে বাস্তবে সেই পূর্বাভাসের কাছাকাছিও যায়নি বাজার।
তেলের দাম প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের তেলের চাহিদা কমে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড উৎপাদন, কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ, বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার এবং বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কার অন্যতম কেন্দ্র ছিল হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারত। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম দ্রুত রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল যথেষ্ট বাস্তব।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। সংঘাত শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম মূল্য সর্বোচ্চ প্রায় ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠলেও তা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়কার সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর ১১ জুন পর্যন্ত সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০১ ডলার। সংঘাত শুরুর আগে এই দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার।
পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করে। জুলাইয়ের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি, অর্থাৎ প্রায় ৭০ ডলারে নেমে আসে। তবে পরবর্তী সময়ে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে।
তারপরও বাজারে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের আতঙ্ক দেখা যায়নি। বরং তেলের বাজারের বর্তমান চিত্র বলছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ তৈরি হলেও তা এখনো বৈশ্বিক সংকটে রূপ নেয়নি।
চীনের দুর্বল চাহিদা বাজারে বড় স্বস্তি দিয়েছে
তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এসেছে চীন থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশটির চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের চাপ অনেকটাই কমেছে।
জুন নাগাদ চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। পাশাপাশি দেশটি পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিও কমিয়েছে। দেশটির পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ায় প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পেও তেলের ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।
ফলে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা নিয়ে যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্প উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তাও তেলের বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশাকে দুর্বল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড উৎপাদন সামলেছে সরবরাহের চাপ
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশটি এপ্রিল মাসে দৈনিক উৎপাদন রেকর্ড প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে উন্নীত করে।
এর পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কৌশলগত মজুত থেকেও তেল ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে বাজারে তেল সরবরাহ করে। এর ফলে সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব কিছুটা প্রশমিত হয়।
উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মজুত থেকে সরবরাহ—দুই দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বাজারে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করেছে। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ে দেশটি নিট তেল রপ্তানিকারক হিসেবেও অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন
তেলের বাজারে দামের ওঠানামার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধবিরতি, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় তেল পরিবহন স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
এসব বক্তব্য বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত রেখেছে। অনেক ব্যবসায়ী ধারণা করেছিলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বাড়তে পারে। কিন্তু একই সময়ে যুদ্ধ দ্রুত থেমে যাওয়া বা সরবরাহপথ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায়নি। ফলে বড় ধরনের মজুত গড়ে তোলা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের বিশ্লেষক ইলিয়া বুচুয়েভের মতে, বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রত্যাশা থাকলেও ব্যবসায়ীরা বড় আকারের মজুত বা বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। কারণ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
সংঘাত শুরুর পর তেলের দাম বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় অনেক বিনিয়োগকারী বাজারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু জুলাইয়ের শুরুতে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে তাঁরা বিনিয়োগ কমিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে আবারও সংঘাত তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় ১৪ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রত্যাশায় নতুন বিনিয়োগ বাড়তে দেখা যায়।
তবে এই বিনিয়োগ এখনো মার্চের শেষ দিকের তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে তেলের দাম বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় বাজারে থাকা বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৮০ কোটি ডলার। মার্চের শেষ দিকে এই পরিমাণ ছিল এর দ্বিগুণেরও বেশি।
হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুটে সরবরাহ অব্যাহত
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবও সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার করেছে। দেশটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ কমে গেলেও তার একটি অংশ বিকল্প পথে বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
জুনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন সাময়িকভাবে স্বাভাবিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও কমে আসে। যদিও জুলাইয়ে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল আবারও কিছুটা কমে যায়, তবুও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা বাজারকে বড় ধরনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করেছে।
তাৎক্ষণিক সরবরাহে এখনো বড় সংকট নেই
তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহের ঘাটতি না থাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল বাজারে দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ উত্তর সাগরের ফোর্টিজ গ্রেডের তেল। সাধারণত বাজারে প্রকৃত সংকট তৈরি হলে দ্রুত সরবরাহযোগ্য এই ধরনের তেল উচ্চ প্রিমিয়ামে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে ফোর্টিজ গ্রেডের তেল বরং ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে। এর অর্থ হলো, বাজারে তেলের তাৎক্ষণিক সংকট এখনো তৈরি হয়নি এবং ক্রেতাদের মধ্যেও ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দেয়নি।
ফলে সংঘাতের মাত্রা বাড়লেও বাজারে তেলের দাম এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি।
সামনে কী হতে পারে
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকেরা। ভূরাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে চীনের চাহিদা হঠাৎ বাড়লে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাজারে নতুন করে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া যুদ্ধের বিস্তার যদি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে প্রভাবিত করে, তাহলে বর্তমান সরবরাহ ভারসাম্য দ্রুত বদলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম আবারও দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান তেলবাজারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলেও চাহিদার দুর্বলতা, বাড়তি উৎপাদন, কৌশলগত মজুত, বিকল্প রপ্তানি পথ এবং পর্যাপ্ত তাৎক্ষণিক সরবরাহ—এই কয়েকটি বিষয় এখন পর্যন্ত দামকে লাগামহীনভাবে বাড়তে দেয়নি। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি কতটা বদলাবে, সেটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ তেলের বাজারে সরবরাহের সামান্য ব্যাঘাতও একদিকে জ্বালানি মূল্য বাড়াতে পারে, অন্যদিকে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

