দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও গতিশীল করতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর আদায়ব্যবস্থা আধুনিক করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
রাজধানীর মতিঝিলে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করতে সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পুঁজিবাজার পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ নিশ্চিত করা, যাতে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, মানুষের জীবনমানের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
আস্থার সংকট কাটানো জরুরি
সেমিনারে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মানুষের আস্থা। বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলকে ঘিরে যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয় দেখা যাচ্ছে, তা মূলত আস্থার ঘাটতিরই প্রতিফলন।
তার মতে, সরকার থেকে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষ পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এ কে এনামুল হক আরও বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালুর কথা বলা হলেও বাস্তবে তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করতে এখনও বিভিন্ন দপ্তর থেকে একাধিক অনুমোদন নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।
মূল্যস্ফীতি বড় চ্যালেঞ্জ
সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবু ইউসুফ বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে—রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে বাজারে পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা যাতে বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর তাগিদ
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো অনেক দেশের তুলনায় কম। উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরকারি ব্যয় নির্বাহে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করে কর আদায়ের আওতা বাড়াতে হবে।
এ ছাড়া কর প্রশাসনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং করদাতাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো সম্ভব বলে মত দেন তারা।
সেমিনারে উপস্থিতি
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মনজুর হোসেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম জাহাঙ্গীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আখতার হোসেন।
প্যানেল আলোচনায় অনলাইনের মাধ্যমে অংশ নেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার। তিনি বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে আরও গতিশীল করতে হবে এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কার্যকর নীতিমালা এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারলে দেশের অর্থনীতি আগামী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

