দেশের পুঁজিবাজারে বন্ডভিত্তিক অর্থায়নে নতুন গতি এসেছে। ঋণের চাপ কমানো এবং বিকল্প উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহে বড় উদ্যোগ নিয়েছে শিল্প ও উন্নয়ন খাতের দুটি প্রতিষ্ঠান। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা Bangladesh Securities and Exchange Commission (বিএসইসি) সম্প্রতি সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ এবং Sajeda Foundation-এর দুটি পৃথক বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে।
সিটি সুগারের ১,৩০০ কোটি টাকার বন্ড
দেশের চিনিশিল্পে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ বাজার থেকে ১,৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যে একটি করপোরেট বন্ড ছাড়ছে। তিন বছর মেয়াদি এই বন্ডটি মেয়াদ শেষে সম্পূর্ণ অবসায়িত (রিডিমড) হবে।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, উচ্চ সুদের দায় কমিয়ে আর্থিক কাঠামোকে আরও টেকসই করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
বন্ডটির বৈশিষ্ট্য—
- মেয়াদ: ৩ বছর
- মোট আকার: ১,৩০০ কোটি টাকা
- ইউনিটপ্রতি অভিহিত মূল্য: ১৩ লাখ টাকা
- সম্ভাব্য মুনাফা হার: প্রায় ১৩.৫%
- ইস্যু পদ্ধতি: প্রাইভেট প্লেসমেন্ট
এই বন্ড করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা কোম্পানি এবং উচ্চ সম্পদশালী বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে। বন্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করবে BRAC EPL Investments। এছাড়া এটি শেয়ারবাজারের অলটারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নে প্রথম ‘অরেঞ্জ বন্ড’
অন্যদিকে, উন্নয়ন খাতে একটি নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে সাজেদা ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রথম ‘অরেঞ্জ বন্ড’ ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে, যার মাধ্যমে ১৫৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হবে।
‘অরেঞ্জ বন্ড’ মূলত এমন একটি সামাজিক বন্ড, যা নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এটি জেন্ডার-ফোকাসড ফাইন্যান্সিংয়ের একটি উদীয়মান ধারা হিসেবে বিবেচিত।
বন্ডটির প্রধান বৈশিষ্ট্য—
- মোট আকার: ১৫৮.৫০ কোটি টাকা
- মেয়াদ: ১ থেকে ৩ বছর
- সুদহার: ৭% থেকে ১১.৫%
- ইউনিটপ্রতি অভিহিত মূল্য: ৩,৩৩,৩৩৩ টাকা
- ইস্যু পদ্ধতি: প্রাইভেট প্লেসমেন্ট
এই বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ব্যবসা সহায়তা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পুঁজিবাজারে বন্ডের গুরুত্ব বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের আর্থিক খাতে বন্ডের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি কার্যকর বিকল্প, আর বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক স্থিতিশীল রিটার্নের সুযোগ তৈরি করে।
বিশেষ করে সামাজিক ও টেকসই উন্নয়নমুখী বন্ড—যেমন অরেঞ্জ বন্ড—ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, একদিকে শিল্প খাতের আর্থিক পুনর্গঠন, অন্যদিকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন—দুই ক্ষেত্রেই এই বন্ড ইস্যুগুলো দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

