বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের আইসিটি পাঠ্যবই এখনও মূলত HTML, Number System আর Networking-এর মতো প্রাথমিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ। অথচ দেশের প্রযুক্তি খাতে এখন প্রয়োজন Cyber Security, AI Integration, MERN Stack-এর মতো অত্যাধুনিক দক্ষতা। শিক্ষাব্যবস্থা আর বাস্তব চাহিদার মধ্যে এই বিশাল ফাঁকটা পূরণ করছে আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশ — এমনটাই জানাচ্ছেন সিজন ৩-এর একাধিক অংশগ্রহণকারী। আগামী জুন মাসে অনুষ্ঠিতব্য গালা রাউন্ডকে সামনে রেখে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
চট্টগ্রাম কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহমেদ আজমেইন মাহতাব পাঠ্যবই ও অলিম্পিয়াডের পার্থক্য নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেয়েছেন। তিনি জানান, কলেজের আইসিটি বইয়ে শুধু বেসিক বিষয় থাকায় তিনি উন্নত প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। আইসিটি অলিম্পিয়াডের মডিউলগুলো তাঁর সামনে একটি সম্পূর্ণ নতুন দুনিয়া খুলে দিয়েছে — সাইবার সিকিউরিটি, এআই ইন্টিগ্রেশনের আধুনিক ধারা, রিয়েল-লাইফ প্রবলেম সলভিং। ইতোমধ্যে তিনি নিজেই একটি কুইজ প্ল্যাটফর্ম ‘নিউরোনার্ডস’ তৈরি করে ফেলেছেন।
“পাঠ্যবই আমাদের বেসিক দেয়, কিন্তু অলিম্পিয়াডের মডিউলগুলো আমাদের ‘ইন্ডাস্ট্রি-রেডি’ হতে সাহায্য করে। এটি আমার কোডিং স্কিল এবং লজিক্যাল থিংকিংকে অনেক বেশি ধারালো করেছে।”
একই কথা বলছেন রাজশাহী থেকে আসা মীর জুহায়ের উল ইসলাম আসিফ। তিনি জানান, স্কুলের বই তাত্ত্বিক জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল হলেও অলিম্পিয়াডের মডিউলগুলো সম্পূর্ণ প্রায়োগিক ও সমস্যা-সমাধানমুখী। এই বাস্তবভিত্তিক শেখা তাঁর লজিক্যাল চিন্তা ও প্রোগ্রামিং দক্ষতার ভিত গড়ে দিয়েছে, যা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি কাজে দেবে।
ঢাকার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসিন ইসলাম সাআদের দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু ভিন্ন। তিনি বলছেন, অলিম্পিয়াডে ক্লাস ১ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবাই একই মঞ্চে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারছেন — এটাই এই প্ল্যাটফর্মকে অনন্য করে তোলে। তাঁর কথায়, গণিত, পদার্থ, রসায়ন বা জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড তো আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আইসিটির জন্য এমন একটি নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এর আগে ছিল না।
“আইসিটি অলিম্পিয়াড অন্য সব প্রতিযোগিতার চেয়ে আলাদা কারণ এখানে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হয়। ১২ থেকে ১৩টি আলাদা ও আপডেটেড টপিক রয়েছে, যা স্কুলের বইয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।”

নরসিংদী বিয়াম জিলা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী অত্রি চ্যাটার্জী মাত্র ছোট্ট বয়সেই বুঝে গেছেন পার্থক্যটা। তিনি জানান, বোর্ডের বইগুলোতে অনেক বিষয় থাকলেও অলিম্পিয়াডের বইগুলোতে আরও গভীর আলোচনা ও বিস্তৃত পরিসরের বিষয় থাকে। তাঁর মতে, AI ও Machine Learning-এর এই যুগে আইসিটি দক্ষতাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
ঢাকার সানিডেইল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ তারাজ তাশফীন — হ্যাঁ, মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে সে আইসিটি অলিম্পিয়াডে অংশ নিচ্ছে! তাশফিনের সরল কথায়, ‘ICT easy and interesting। Please try it and enjoy it।’ এই ক্ষুদে প্রতিযোগীর উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে আইসিটি অলিম্পিয়াডের দরজা সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য উন্মুক্ত — প্রি-স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।
ঢাকার জলসিড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল- এর শিক্ষার্থী শাহনেয়াজ কবির মনে করেন, অলিম্পিয়াডের কন্টেন্ট যদি জাতীয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা যেত, তাহলে বাংলাদেশের আইসিটি খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির গতি কয়েকগুণ বেড়ে যেত। তিনি বলছেন, এই অলিম্পিয়াড শুধু পড়াশোনার জন্য নয়, দৈনন্দিন জীবনেও অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
আগামী জুন মাসে আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশ সিজন ৩-এর গালা রাউন্ডে এই সকল শিক্ষার্থী একই মঞ্চে মুখোমুখি হবেন। ক্লাস ১-এর ছাত্র থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী, মাদরাসার ছাত্র থেকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী — সকলের মিলনস্থল হয়ে উঠবে এই গালা রাউন্ড। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই প্ল্যাটফর্মটি বাংলাদেশের আইসিটি শিক্ষায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে — যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের সীমানায় আটকে না থেকে বিশ্বমানের প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জন করতে পারছেন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, যে জাতি আজকের শিশু ও কিশোরদের আইসিটিতে দক্ষ করে তুলতে পারবে, সেই জাতিই আগামীর ডিজিটাল অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবে। আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যে একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

