রাজধানীতে টানা ভারী বর্ষণ ও বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে জনজীবনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাও বড় ধরনের চাপে পড়েছে। সড়কে পানি জমে থাকায় একদিকে ক্রেতাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বেশ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে মাছ, কাঁচা মরিচ এবং মৌসুমি সবজির বাজারে দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, অনেক দোকান আংশিক খোলা থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। ফলে বাজারে স্বাভাবিক লেনদেনও ব্যাহত হয়েছে।
সরবরাহ সংকটে বাড়ছে দাম
বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে সবজি ও মাছবাহী ট্রাকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে খুচরা বাজারে।
বর্তমানে কাঁচা মরিচের দাম প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ১২০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে। একইভাবে শসা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, লাউ, লেবুসহ বিভিন্ন সবজির দাম প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মাছের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, শিং, কই, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের দাম প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জলাবদ্ধতা ও পরিবহন সংকটের কারণে পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে।
জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত ব্যবসা
শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে রাজধানীর গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ঝিগাতলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অনেক সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ই দুর্ভোগে পড়েন।
অনেক দোকানদার জানান, স্বাভাবিক দিনে সকাল থেকেই ভালো বিক্রি হলেও এদিন দুপুর পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ ছিল অত্যন্ত কম। কিছু ব্যবসায়ী দিনের অধিকাংশ সময় ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থেকেও উল্লেখযোগ্য বিক্রি করতে পারেননি।
নিউমার্কেটে সাময়িক স্থবিরতা
রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ বিপণিকেন্দ্র নিউমার্কেটেও জলাবদ্ধতার কারণে দোকানপাট খোলা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। ফলে পুরো মার্কেট এলাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ী নেতারা জানান, পানি না নামা পর্যন্ত স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ক্রেতা উপস্থিতিও ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
টানা বর্ষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ভাসমান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও খোলা স্থানে যাঁরা ফল, পোশাক, সবজি কিংবা অন্যান্য পণ্য বিক্রি করেন, তাঁদের অধিকাংশই বিক্রি করতে পারেননি।
ফল বিক্রেতারা জানান, স্বাভাবিক দিনে কয়েক হাজার টাকার বিক্রি হলেও এদিন সারাদিনে অল্প কিছু বিক্রিই হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে দোকান খোলা রাখলেও ক্রেতার অভাবে অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে উদ্বেগ
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিনও দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজার সরবরাহে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বৃষ্টির ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর জলাবদ্ধতা নিরসন, দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখা এবং কৃষিপণ্য সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখা গেলে বাজারে মূল্যচাপ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য স্বল্পমেয়াদি সহায়তা ও সহজ ঋণ সুবিধা চালু করলে তারা এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজধানীর বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। আবহাওয়ার উন্নতি এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে মূল্যস্থিতি ফিরতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

