দেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে সরকার। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ছয় মাসে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এই সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা কমিশনে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ২২টি ফাউন্ডেশনের ১৮০ দিনের কর্মসূচি ও কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে আড়াল না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় নিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা
সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো। এ লক্ষ্যে দুই গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি খসড়া পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের কাঠামো কী হবে, সে বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে বাজেটে বরাদ্দ থাকা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয়ের ওঠানামার কারণে আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। স্থানীয়ভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য তুলনামূলক স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রাহকই হবে বিদ্যুৎ উৎপাদক
সরকার শুধু বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। আবাসিক ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও অন্যান্য গ্রাহককে বিদ্যুতের ব্যবহারকারীর পাশাপাশি উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ জন্য নেট মিটারিং ব্যবস্থার বিদ্যমান জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে কোনো গ্রাহক নিজস্ব স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। এতে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিল কমানোর এবং গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়।
তিতুমীর জানান, এ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এবং বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) মতো প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত অর্থায়ন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রাহক বা বিদ্যুৎ উৎপাদক মোট প্রকল্প ব্যয়ের ২০ শতাংশ বহন করবেন। আরও ২০ শতাংশ অর্থ দেবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা অ্যাগ্রিগেটর। বাকি ৬০ শতাংশ অর্থ সরকারি ঋণের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে।
এ কাঠামোর মাধ্যমে ঋণের সুদের হার ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান উপদেষ্টা।
জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন কৌশল
বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও নগরজীবন—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চয়, গ্রিড আধুনিকায়ন, বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত ও বিতরণ করার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেও সরকারের নতুন পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ২২টি ফাউন্ডেশনের একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের জানান, পিকেএসএফ পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা এবং অর্থায়নের মাধ্যমে এসব কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতেও কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পিকেএসএফের ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণচুক্তি হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার অতিরিক্ত অর্থায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও অর্থায়ন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা
বৈঠকে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলোর কার্যক্রমকে পাঁচটি প্রধান ক্লাস্টারে ভাগ করে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’, সৌরবিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা এবং নতুন কর্মসংস্থান।
‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত সম্ভাবনাময় পণ্যকে বাণিজ্যিকভাবে বিকশিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর ফলে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাস্তবায়নে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ
সরকারের এসব কর্মসূচির সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং প্রকল্পগুলোর যথাযথ পরিবীক্ষণের ওপর। এ কারণে কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব সরকারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মাধ্যমে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান—দুটি উদ্যোগই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, যথাযথ অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের পাঁচ বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য আসার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক নতুন বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

