নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চিলাহাটি এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা দূর থেকেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু কাছে গেলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ব্যস্ততা কিংবা কর্মচাঞ্চল্যের বদলে সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের বাইরে পড়ে থাকায় ভবনের বিভিন্ন অংশে জমেছে ধুলা। একতলার বারান্দায় সারি সারি ফ্যান থাকলেও সেগুলো আর ঘোরে না। জানালা দিয়ে দেখা যায় প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল ও স্টিলের টুল—যেগুলো ব্যবহারের অপেক্ষায় থাকলেও দিনের পর দিন অব্যবহৃত পড়ে আছে।
দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি কক্ষগুলোও এখন ফাঁকা। তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁ পরিচালনার জন্য নির্ধারিত জায়গাটিও পড়ে আছে নিস্তব্ধ। পাশেই থাকা দোতলা ভিআইপি অতিথিশালা তালাবদ্ধ। একইভাবে অচল হয়ে আছে ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি ও গার্ডরুম। সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেলপথেও পড়েছে মরিচা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে বিপুল সরকারি অর্থ। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে চিলাহাটি স্থলবন্দর ও সংশ্লিষ্ট রেল যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ১২৮ কোটি টাকা। রেলপথ, ওয়াগন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত করলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের পরও স্থায়ী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি চিলাহাটি। বরং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারি অর্থের বড় একটি অংশ এখন কার্যত অচল সম্পদে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর চালু, অল্প সময়েই বন্ধ
চিলাহাটি সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ী। ব্রিটিশ আমল থেকেই চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথ দুই অঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায় এই রেল যোগাযোগ। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর দুই দেশের উদ্যোগে আবারও রেলপথটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে চিলাহাটিকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর নানা প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালে স্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। দুই দেশের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুতের পর ২০২১ সালের ১ আগস্ট পণ্য পরিবহন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে চালু করা হয় ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটের আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালী এক্সপ্রেস’।
অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর চিলাহাটি নতুন করে উত্তরাঞ্চলের আন্তদেশীয় বাণিজ্য ও যোগাযোগের সম্ভাবনার দ্বার খুলেছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
২০২৪ সালে পাথর আমদানি কমে যাওয়ার পর পণ্য পরিবহন কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাত্রীবাহী ট্রেনের চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণ দেখিয়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থলবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
বিনিয়োগের সুফল কোথায়?
চিলাহাটি প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোগুলোর ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
প্রকল্পের আওতায় স্টেশনে একাধিক রেললাইন, প্ল্যাটফর্ম, ফুটওভারব্রিজ, রেল কোচ পরিষ্কার ও মেরামতের শেডসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শুল্ক, ব্যাংকিং, ইমিগ্রেশন এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রয়োজনীয় সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য ইমিগ্রেশন সুবিধা চালুর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। ফলে ধারণা করা হয়েছিল, চিলাহাটি হয়ে ভারতসহ আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠবে পরিবহন, গুদাম, হোটেল-রেস্তোরাঁ, শ্রমবাজার, সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা ও অন্যান্য সহায়ক সেবা।
কিন্তু স্থলবন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার আগেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই প্রত্যাশার বড় অংশই এখন অনিশ্চিত।
পণ্য পরিবহন বন্ধে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় অর্থনীতি
চিলাহাটি দিয়ে পণ্য পরিবহনের সময় ভারত থেকে মূলত পাথরবোঝাই মালবাহী ট্রেন আসত। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কোনো মাসে চার থেকে পাঁচটি পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন চলাচল করেছে। প্রতিটি চালান থেকে পাথরের পরিমাণ অনুযায়ী রেলওয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া পেত। মাসিক হিসাবে এই আয় এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাত।
পণ্য পরিবহন ঘিরে সীমান্ত এলাকায় তৈরি হয়েছিল শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ঠিকাদার ও ছোট ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থান। স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়েছিল। এমনকি বন্দরকেন্দ্রিক সম্ভাবনা বিবেচনায় আশপাশের জমির চাহিদা ও মূল্যও বেড়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর সেই অর্থনৈতিক গতি থেমে গেছে। কাজ হারিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ। বন্দরকে ঘিরে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা উদ্যোক্তারাও এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
অর্ধেকে নেমেছে রেলস্টেশনের আয়
স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু সীমান্ত বাণিজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেলওয়ের রাজস্বও। চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে স্টেশনটির আয় ছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। দুই বছর পর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সেই আয় নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকায়।
অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে স্টেশনটির মাসিক আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনের অনুপস্থিতিতে স্টেশনের বাণিজ্যিক গুরুত্বও কমে গেছে।
স্টেশনে বর্তমানে দুইজন স্টেশন মাস্টারসহ ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাঁদের কাজের পরিধিও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এখন মূলত অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী ট্রেনের ওপরই নির্ভর করছে স্টেশনের নিয়মিত কার্যক্রম।
উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের বড় প্রত্যাশা
চিলাহাটি স্থলবন্দরকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। তাঁদের মতে, এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে শুধু ভারত নয়, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও উত্তরাঞ্চল নতুন সুবিধা পেতে পারে।
বিশেষ করে পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য রেলপথে পরিবহনের সুযোগ থাকায় সড়কপথের তুলনায় পরিবহন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে উত্তরাঞ্চলের নির্মাণ খাত, শিল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নীলফামারী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদের মতে, চিলাহাটি দিয়ে পাথর পরিবহন করা গেলে সৈয়দপুরসহ আশপাশের এলাকায় তুলনামূলক কম খরচে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব। বর্তমানে বিকল্প রুট ও সড়কপথ ব্যবহারের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। স্থলবন্দর বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সরকার—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়ছে।
দুই দেশের সমন্বয়ই মূল চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের বক্তব্য অনুযায়ী, চিলাহাটি স্থলবন্দর আপাতত পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ায় নেই। এটি চালু করতে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশের সম্মতি প্রয়োজন। ফলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় প্রশাসন বা কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে সমাধান হওয়ার নয়; প্রয়োজন দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
এ কারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যে নির্মিত অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ভবন, রেললাইন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থাপনা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তখন বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করতেও সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন
চিলাহাটি স্থলবন্দরকে ঘিরে যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার যথাযথ অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকল্পের সাফল্য আসে না; সেই অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ও রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রুটের সম্ভাবনা নতুন করে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত, কাস্টমস, রেলওয়ে ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।
কারণ, শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অবকাঠামো যদি দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ পড়ে থাকে, তাহলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়—একটি সম্ভাবনাময় সীমান্ত অর্থনীতিরও অপচয়। চিলাহাটির ক্ষেত্রে এখন প্রয়োজন নতুন করে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ, যাতে বিনিয়োগ করা অর্থ সম্পদে পরিণত হয় এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষ এর সুফল পায়।

