স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি উত্তরণ ইস্যুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। খুব দ্রুত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, প্রথম সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিষয়টি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেখা হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখে সরকারের কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রপ্তানিতে একমুখী নির্ভরতা, বাড়বে বৈচিত্র্য
রপ্তানি আয়ের নিম্নগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে একটি পণ্য খাত থেকে, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই নির্ভরতা কমাতে নতুন পণ্য খাত চিহ্নিত করা, অপ্রচলিত খাতে প্রণোদনা দেওয়া এবং নতুন বাজারে প্রবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সম্ভাবনাময় শিল্পখাতে বিনিয়োগে আগ্রহী বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো—রপ্তানি আয় টেকসইভাবে বাড়ানো এবং বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি সম্প্রসারণ।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও নীতিগত সতর্কতা
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করেছে। উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভুল করার সুযোগ খুবই সীমিত। দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় নীতিনির্ধারণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
গত কয়েক মাসে যে অর্থনৈতিক মন্থরতা দেখা গেছে, সেখান থেকে দ্রুত উত্তরণের লক্ষ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রোজার বাজারে স্থিতিশীলতার আশ্বাস
আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারও স্থিতিশীল থাকবে। সরকারের হাতে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আমদানি পাইপলাইনেও যথেষ্ট সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
পণ্য বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেবল বক্তব্য নয়—কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ফলাফল দেখাতে চান। বাজার তদারকি জোরদার ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিনিয়োগে স্থিতিশীল পরিবেশের গুরুত্ব
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর বলেন, অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা তখনই আগ্রহী হন, যখন তারা নিশ্চিত হন যে তাঁদের পুঁজি ও শ্রমের বিপরীতে যুক্তিসংগত মুনাফা পাওয়া যাবে। তাই স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিপরিবেশ গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আকার বড় এবং প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। টানা দুই থেকে তিন বছর বিনিয়োগ স্থবির থাকায় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। দ্রুত বিনিয়োগ প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা না গেলে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভুল হলে তা ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ থাকল। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও টেকসই পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

