দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে সোনার দাম। এক দিনের ব্যবধানে সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরিতে দাম বেড়েছে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা। ফলে নতুন দামে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনা কিনতে এখন গুনতে হবে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা।
শনিবার সকাল ১০টা থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে সোনার দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের বৈঠকে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলামের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন মূল্যতালিকা জানানো হয়।
কোন সোনার দাম কত
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। একইভাবে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৪১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৩১ টাকা।
এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতির সোনার প্রতি ভরির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২২ টাকা।
এর আগে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকা। ২১ ক্যারেটের দাম ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৩৪২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৭৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৮ টাকা।
অর্থাৎ, নতুন করে দাম বাড়ানোর ফলে সব ধরনের সোনার ক্ষেত্রেই ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে।
এক সপ্তাহে কয়েক দফা ওঠানামা
সোনার বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দেশের বাজারে এক ভরি সোনার দাম এক লাফে ১০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এর পরদিন শুক্রবার আবার সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২২৬ টাকা পর্যন্ত দাম কমানো হয়। এক দিনের বিরতির পর শনিবার আবারও দাম বাড়াল বাজুস।
ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের বাজারে সোনার দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দ্রুত মূল্যপরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের তেজাবি সোনার দামের ওঠানামাও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে জুয়েলার্স খাত।
বেড়েছে রুপার দামও
শুধু সোনা নয়, দেশের বাজারে রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৯৯ টাকা। ২১ ক্যারেটের রুপার প্রতি ভরির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দামেও বড় ধরনের উত্থান হয়েছে। গত শুক্রবার প্রতি আউন্স রুপার দাম ৬৩ ডলারের বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে বড় উল্লম্ফন
বিশ্ববাজারে শুক্রবার সোনার দামে বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়। এক দিনে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১০০ মার্কিন ডলারের বেশি বেড়েছে, যা সাম্প্রতিক কয়েক মাসের মধ্যে এক দিনের সবচেয়ে বড় উত্থানগুলোর একটি।
গত এক মাসের হিসাবেও সোনার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। এই সময়ে প্রতি আউন্স সোনার দাম প্রায় ১১০ ডলার বেড়েছে। অর্থাৎ, এক মাসে যতটা দাম বেড়েছে, তার প্রায় পুরোটা বৃদ্ধিই এক দিনে হয়েছে।
বিশ্ববাজারে সোনার এই দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদে ঝোঁক এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণ কাজ করছে।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সোনায় বিনিয়োগের চাপ
চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে একাধিকবার বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা গেছে। জানুয়ারিতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করে।
পরবর্তী সময়ে দাম কিছুটা কমে এলেও ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও সোনার দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয় এবং দাম ৫ হাজার ডলারের ওপরে উঠে যায়। পরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবর এলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে এবং সোনার দাম ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে।
এরপর প্রায় দুই মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ৪ হাজার ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও বাজারের নতুন গতিপ্রকৃতিতে আবারও মূল্য বাড়তে শুরু করেছে।
ক্রেতাদের ওপর বাড়ছে চাপ
দেশের বাজারে সোনার দাম ধারাবাহিকভাবে ওঠানামা করায় সাধারণ ক্রেতা, গহনা ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে বিয়ে ও পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সোনার গহনা কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
অন্যদিকে, সোনার দাম বাড়ায় পুরোনো গহনা বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহে আগ্রহী ব্যক্তিরাও তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে দাম দ্রুত ওঠানামা করায় বাজারে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের গতিপথ, ডলার ও অন্যান্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচকের পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে দেশের বাজারে ভবিষ্যতে সোনার দাম কোন দিকে যাবে।

