যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি নতুন করে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক গবেষকেরা। তাঁদের মতে, চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক আইনি প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায়কে সামনে রেখে কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন—তবে তা হতে হবে ধাপে ধাপে ও সুপরিকল্পিতভাবে।
বুধবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ মতামত উঠে আসে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এবং বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও আইনি প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-এর United States Supreme Court প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর আরোপিত পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ প্রভাব কী হতে পারে—তা নিয়েই অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের এই আলোচনা।
বাণিজ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে উভয় দিক রয়েছে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ না করে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তিনি জানান, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি করে, তা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়নাধীন।
শূন্য শুল্ক সুবিধা: বাস্তবতা না ধোঁয়াশা?
গবেষণা প্রতিষ্ঠান South Asian Network on Economic Modeling (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য শুল্কের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এ সুবিধা পেতে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর মতে, এই ধোঁয়াশা দূর না করলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, চুক্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শ ও অংশীজন সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যবসায়ীদের সতর্ক অবস্থান
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, চুক্তি যেহেতু ইতোমধ্যে কার্যকর এবং অংশীদার দেশ যুক্তরাষ্ট্র, তাই হঠাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, অন্যান্য দেশ একই ধরনের চুক্তির পর কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শূন্য শুল্ক সুবিধা কার্যকর হলে তা তৈরি পোশাক খাতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে শর্তাবলি অস্পষ্ট থাকলে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়া কঠিন হবে। প্রয়োজনে চুক্তি পুনর্বিবেচনার অনুরোধও জানানো হয়েছে বৈঠকে।
এনডিএ ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন
চুক্তি প্রক্রিয়া গোপন রাখা হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আলোচনার সময় নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মতো কৌশলগত অংশীদারের সঙ্গে আলোচনায় সংবেদনশীল বিষয় থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি আশ্বাস দেন, জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক কাঠামোর সামান্য পরিবর্তনও রপ্তানি প্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে আইনি সুযোগ কাজে লাগানো, অন্যদিকে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা—দুইয়ের সমন্বয়েই এগোতে হবে।
দ্রব্যমূল্য ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গ
সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী বর্তমান দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। তাঁর দাবি, মন্ত্রণালয় তদারকিকৃত আমদানি পণ্যের দাম স্বাভাবিক রয়েছে; মৌসুমি চাহিদা ও আতঙ্কজনিত কেনাকাটার কারণে কিছু সবজিজাতীয় পণ্যের দাম সাময়িকভাবে বেড়েছিল। বাজার পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি; বর্তমান সরকার দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে।
সামনে কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তি ঘিরে আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ জরুরি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; ফলে কৌশলগত ধৈর্য, আইনি প্রস্তুতি এবং ব্যবসায়িক বাস্তবতার সমন্বয়ে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত ও রপ্তানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যসম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ অবস্থানই এখন সময়ের দাবি।

