দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন M Masrur Reaz। তিনি বলেছেন, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা—সবই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত Pan Pacific Sonargaon Dhaka হোটেলে আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে Prothom Alo। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন Amir Khasru Mahmud Chowdhury।
আলোচনায় মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমানে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, “বিনিয়োগ এখন কার্যত তলানিতে এসে ঠেকেছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।”
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তাঁর মতে, এটি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত।
অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মাসরুর রিয়াজ বলেন, “বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ অনেকটা ভাঙা বাড়ির মতো। সেই বাড়ি সংস্কার না করে যদি নতুন বিনিয়োগকারী আনার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, বিচ্ছিন্ন ও ছোটখাটো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা মূল সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, বিনিয়োগে বড় বাধাগুলো দূর করতে কার্যকর ও গভীর সংস্কার প্রয়োজন।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বিনিয়োগের হার প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, এই স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে তিনি তিনটি ভাগে ব্যাখ্যা করেন। প্রথমত, অর্থনীতির ধীরগতি; দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সুশাসনের দুর্বলতা; এবং তৃতীয়ত, সংস্কার কার্যক্রমের স্থবিরতা। তাঁর মতে, আগামী বাজেটে ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাত পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধির নতুন খাত তৈরি—এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দেশের উৎপাদনশীল সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ হলেও দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এখনও ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও তা এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো শক্তিশালী রিজার্ভ বর্তমানে নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেট বাস্তবায়নে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরেন। প্রথমত, সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলোতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, “দেশে পরিকল্পনার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। জনগণ ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে কথার চেয়ে কাজে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।”

