দেশের স্থবির হয়ে পড়া শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে শিগগিরই একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে নতুন করে টাকা ছাপানো বা ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পথে হাঁটবে না—যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি বিনিয়োগ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
ঢাকার সচিবালয়ে আয়োজিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ও মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নিয়েছে—এমন আলোচনার প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বিষয়টিকে ‘ভুল ব্যাখ্যা’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের লেনদেন একটি নির্ধারিত সীমার মধ্যে পরিচালিত হয় এবং এটি মূলত স্বল্পমেয়াদি নগদ ব্যবস্থাপনার অংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও একই সুরে বলেন, আলোচিত ২০ হাজার কোটি টাকার ‘ছাপানো টাকা’ আসলে বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকারের একটি নির্দিষ্ট হিসাবের মাধ্যমে দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালিত হয়, যেখানে আয়-ব্যয়ের ভিত্তিতে ভারসাম্য ওঠানামা করে—এটি কোনো স্থায়ী ঋণ বা অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ নয়।
শিল্পখাতে নতুন গতি আনতে প্রণোদনা
গভর্নর জানান, দেশের বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে একটি লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই প্যাকেজের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা, পুনঃতফসিল সুবিধা এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ও একীভূতকরণ ভাবনা
দেশের কিছু ইসলামি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আলোচনার মধ্যে গভর্নর বলেন, একীভূতকরণের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, যেখানে রিক্যাপিটালাইজেশন বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার মতো বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে নারীর ভূমিকা
অর্থমন্ত্রী বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের সরাসরি আর্থিক ক্ষমতায়ন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, পরিবারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নারীদের দক্ষতা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ভারসাম্য আনে।
আগামী বাজেটে অগ্রাধিকার খাত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং শিক্ষায় প্রবেশাধিক্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার বিস্তারেও বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
দেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগাতে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
এসএমই ও স্টার্টআপে নতুন সম্ভাবনা
অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাতই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারায় আনতে ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।
রাজস্ব ও বাজার ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত না হলে রাজস্ব আয়ও প্রত্যাশিতভাবে বাড়বে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠনের বিষয়ে একটি কমিটি কাজ করছে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক ভারসাম্য নিশ্চিত করাই টেকসই সমাধান।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ স্বীকার
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত বর্তমানে চাপে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না, ফলে কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে, যা অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

