বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর এখন অত্যন্ত জরুরি—এমন মত দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা। তারা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগীরা ইতোমধ্যে এ ধরনের চুক্তির সুবিধা নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ যদি দ্রুত একই পথে না হাঁটে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত ‘দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সংলাপে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম)-এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, “বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে রয়েছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তাই এখনই এফটিএ নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।”
এলডিসি উত্তরণের পর নতুন বাস্তবতা
বর্তমানে বাংলাদেশ ইইউ বাজারে ‘Everything But Arms (EBA)’ সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর এই বিশেষ সুবিধা আর থাকবে না। ফলে শুল্ক বাড়লে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক—বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি শক্তিশালী এফটিএ থাকলে এই শুল্কঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে এবং ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় থাকবে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত সংস্কার জরুরি
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, কেবল এফটিএ করলেই হবে না, বরং দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। করপোরেট আইনজীবী মারগুব কবির উল্লেখ করেন, “বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু বাজার নয়, নীতিগত স্থিতিশীলতা, কর কাঠামো ও ব্যবসার সহজতাকেও গুরুত্ব দেন। এসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন না হলে এফটিএ থেকেও পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে না।”
ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা জিনিয়া হক বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। তিনি মনে করেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
নতুন বাজারে নজর বাড়ানোর তাগিদ
বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য আনতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আলোচনায়। তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও তুরস্কের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশ বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের নতুন বাজার তৈরি হয়েছে, যা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।”
তার মতে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বাড়ানো গেলে রপ্তানির ঝুঁকি কমবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগই মূল চাবিকাঠি
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ তার উপস্থাপনায় বলেন, নতুন সরকারের সামনে স্বল্প সময়ে প্রায় এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। “এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বড় পরিসরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ও অভ্যন্তরীণ সংস্কার—দুটোই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে,”—বলেন তিনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া। ইইউর সঙ্গে এফটিএ আলোচনা জোরদার করা, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন, এবং রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
অন্যথায়, এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

