Wednesday, September 23

দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকদের হিসাবের জমাকৃত মূল অর্থ (Principal Amount) এককালীন উত্তোলন বা নগদায়নের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে এ পর্যায়ে উত্তোলন করা মূল টাকার বিপরীতে কোনো মুনাফা প্রদান করা হবে না।

এ সুবিধা পেতে আগ্রহী গ্রাহকদের কাছ থেকে আগামীকাল মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে আবেদন গ্রহণ করবে ব্যাংকের শাখাগুলো। গ্রাহকদের আবেদন গ্রহণ ও অর্থ ফেরতের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে ইতোমধ্যে শাখা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা বিশেষ এক নির্দেশনায় সব বিভাগীয় প্রধান, জোনাল প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অপারেশনসের প্রধান সমন্বয়ক এ এফ সাব্বির আহমদ স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।

১ সেপ্টেম্বর থেকে স্বাভাবিক লেনদেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন পুনরায় চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে লেনদেন চালুর পাশাপাশি বড় পরিসরে নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিভিন্ন শাখা ও উপশাখা থেকে নগদের চাহিদা বা রিকুইজিশন সংগ্রহ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের জোগান এবং নিরাপদ ক্যাশ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হচ্ছে।

এ কারণে ১ সেপ্টেম্বর থেকে লেনদেন চালু হলেও ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতের মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

যেসব হিসাব থেকে মূল টাকা তোলা যাবে

ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রাহকেরা তাঁদের আল-ওয়াদিয়া চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব এবং বিভিন্ন মেয়াদি আমানত হিসাব থেকে জমাকৃত মূল অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। এর মধ্যে এমটিডিআর ও ডিপিএসের মতো মেয়াদি হিসাবও রয়েছে।

তবে কোনো গ্রাহক যদি তাঁর হিসাব বন্ধ না করে ব্যাংকে চালু রাখেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট হিসাবের চুক্তি ও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ভবিষ্যতে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ অব্যাহত থাকবে। ব্যাংকের কার্যক্রম ধীরে ধীরে পূর্ণমাত্রায় স্বাভাবিক হলে গ্রাহকেরা মুনাফাসহ প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ জমা ও উত্তোলনের আরও বিস্তৃত সুবিধা পাবেন বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আস্থা ফেরাতে ১ সেপ্টেম্বর বিশেষ আয়োজন

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন আমানতের অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রাহকদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ হিসেবে ১ সেপ্টেম্বরকে বিশেষভাবে ‘গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠন দিবস’ হিসেবে পালনের নির্দেশনা দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ

এ উপলক্ষে শাখা ও উপশাখাগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয়ভাবে সাজানোর পাশাপাশি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত ও মার্জিত পোশাকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে তাঁদের ফুল বা উপহার দিয়ে স্বাগত জানানোর কথাও বলা হয়েছে।

বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ নাগরিক, নারী ও প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শাখায় সুন্দর ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ বজায় রাখা, গ্রাহকসেবার মান বাড়ানো এবং গ্রাহকদের সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকের পক্ষ থেকে শাখাগুলোর সেবা কার্যক্রমের ভিডিও ধারণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন ব্যাংকটির কার্যক্রমে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকসেবার মান পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অনিয়ম ও আর্থিক সংকটের পর নতুন ব্যাংক

বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক দুর্বলতা ও জালিয়াতির অভিযোগে দীর্ঘ সময় ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হয়ে নতুন ব্যাংকটির যাত্রা শুরু করে।

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবেই রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা

অন্যদিকে, পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ৮৬ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি বলে জানা গেছে।

সরকারের মালিকানায় নতুন কাঠামো

সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গত বছরের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা

পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আমানত উত্তোলনে ভোগান্তিতে থাকা গ্রাহকদের জন্য মূল আমানত ফেরতের উদ্যোগটি ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই প্রক্রিয়ার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করা, গ্রাহকসেবা স্বাভাবিক রাখা এবং ভবিষ্যতে ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version