ইরান–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার মধ্যেও মার্চ মাসে দেশে প্রবাসী আয় রেকর্ডে পৌঁছেছে। তবে পণ্য রপ্তানি ক্ষেত্রের অবস্থা অতটা সুখকর নয়। চলতি বছর মার্চে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, যা গত বছরের তুলনায় বিশাল হ্রাস নির্দেশ করছে।
বাণিজ্য ও রপ্তানিকারকরা জানাচ্ছেন, মার্চ মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতরের কারণে শিল্প কারখানায় কার্যদিবস ৮–১০ দিন কম ছিল। ফলে কারখানা থেকে বন্দরে পণ্য সরবরাহও কম হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে ক্রয়াদেশ কমে গেছে। চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে ইউরোপের ক্রেতারা কম দামে বেশি ক্রয়াদেশ নিচ্ছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশে প্রভাব ফেলেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মার্চ মাসে ৪২ কোটি কেজি পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৩৩৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে রপ্তানি হয়েছিল ৪২৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের, অর্থাৎ চলতি বছরের মার্চে রপ্তানি ১৯.৭৮ শতাংশ কমেছে।
রপ্তানি প্রক্রিয়ার তথ্য এনবিআর ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে সংগৃহীত। কাস্টমসের শুল্কায়নের পর পণ্য রপ্তানি হয় এবং সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই তা এনবিআরের তথ্যভান্ডারে নথিভুক্ত হয়। এখানে স্থানীয় রপ্তানি, নমুনা রপ্তানি ও প্রকৃত রপ্তানির হিসাব অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) পণ্য রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। তবে এরপর ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি হয়েছিল ৩৫০ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ০.৫০ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতের। তাই এই খাতের রপ্তানি কমলে সামগ্রিক রপ্তানিও কমে যায়। গত আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাত টানা সাত মাস ধরে হ্রাস দেখিয়েছে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি রপ্তানি বাড়াতে বাধা সৃষ্টি করছে। এছাড়া ডিজেলের সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের অগ্রাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তার লাভ করে। এ সময় বাংলাদেশ থেকে শাকসবজি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যায়।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, “যুদ্ধের কারণে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে সামান্য পণ্য পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু ঝুঁকি ফি প্রতি কনটেইনারে ৩–৫ হাজার ডলার। এই অতিরিক্ত ফি দিয়ে টেকসই রপ্তানি সম্ভব নয়।”
ইপিবি তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩ হাজার ১৯১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ৩.১৫ শতাংশ কম। তুলনামূলকভাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের পতন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট মিলিতভাবে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হ্রাসের প্রধান কারণ।


