Wednesday, September 23

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনীর ইরানে সামরিক হামলার পর পাল্টা জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। হামলা–পাল্টা হামলার জেরে সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছে আঞ্চলিক বিমান চলাচল। একই সঙ্গে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য সরবরাহব্যবস্থায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

সরাসরি বাণিজ্য কম, কিন্তু ঝুঁকি বড়

যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত—মোট পরিমাণ এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। এর বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ইরানে ১ কোটি ৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে পাটের সুতা প্রধান, পাশাপাশি নিট ও ওভেন পোশাকও রয়েছে। আগের কয়েক অর্থবছরে রপ্তানিতে ওঠানামা দেখা গেলেও সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ইরান থেকে মাত্র ৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর আগের তিন বছর আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি ছিল না বললেই চলে।

মূল উদ্বেগ: মধ্যপ্রাচ্যের বড় বাজারগুলো

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ইরান নয়—আসলে উদ্বেগের জায়গা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো। কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত—এসব দেশ বাংলাদেশি পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান বাজার।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব এবং ইরাক। এর মধ্যে ইউএই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে ইউএইতে ৪০ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে বেশি। একই সময়ে সৌদি আরবে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৬২ লাখ ডলার। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ইরাকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য গেছে। তৈরি পোশাক, হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফলমূল, সবজি, জুতা ও ক্যাপ—এসব পণ্যের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যমুখী।

হরমুজ প্রণালি: ব্যয়ের চাপ বাড়ার আশঙ্কা

বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ দ্রুত বাড়তে পারে। এতে আমদানি–রপ্তানির পরিবহন ব্যয় বেড়ে ব্যবসায়ীদের মার্জিন কমে যাবে।

বিকেএমইএ–এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এর মধ্যেই নতুন সংঘাত শিপিং ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। আকাশসীমা বন্ধ থাকলে কার্গো ফ্লাইটও ব্যাহত হবে, ফলে জরুরি চালান পাঠাতে সমস্যা হবে।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতেও শঙ্কা

বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রায় অর্ধেকই যায় মধ্যপ্রাচ্যে। হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, ইউএই, সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাসিক ২–৩ লাখ ডলারের পণ্য যায়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এ বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ভারতের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের পর অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প বাজার হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকেছিল—এখন সেই বাজারই অনিশ্চয়তায়।

জ্বালানি ও রিজার্ভে চাপ

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিড–এর চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাকের মতে, যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাব পুরোপুরি বোঝা না গেলেও তেলের দামে ইতিমধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এলএনজির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি করবে।

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা শিল্প ও পরিবহন খাতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে।

রেমিট্যান্স ঝুঁকিতে?

মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। সংঘাত তীব্র হলে কর্মস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বেতন প্রদানে বিলম্ব বা কর্মসংস্থান সংকট দেখা দিতে পারে। এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে—যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের করণীয়

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা, শিপিং রুট ও বীমা খরচের ওপর নজরদারি জোরদার করা এবং রপ্তানিকারকদের জন্য জরুরি সহায়তা পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও আয় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ জরুরি।

সব মিলিয়ে, ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য সীমিত হলেও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের বিস্তার দেশের রপ্তানি, জ্বালানি আমদানি ও রেমিট্যান্স—এই তিন খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version