দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়াতে কর কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। বিশেষ করে করপোরেট করহার কমানো, মূসক হ্রাস এবং শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে আয়োজিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা। বৈঠকে কর, শুল্ক ও মূসক কাঠামো সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কর বেশি
ফিকির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশে করপোরেট করহার তুলনামূলক কম—যেখানে ভিয়েতনামে ২০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ২২ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশে এই হার প্রায় ২৭.৫ শতাংশ, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরুৎসাহিতকারী হতে পারে।
সংগঠনটির পরামর্শক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, “করহার এত বেশি হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকবে—এটাই স্বাভাবিক।” তিনি মূসকের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার সুপারিশ করেন।
এনবিআরের প্রতিক্রিয়া
ফরেন চেম্বারের প্রস্তাবের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কর আদায়ের সক্ষমতা এখনও অনেক পিছিয়ে। ফলে করহার কমানোর আগে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে করছাড় দেওয়া হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। কর্মসংস্থান বা শিল্পোন্নয়নে এসব ছাড় কতটা ভূমিকা রাখছে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
করজাল সম্প্রসারণ ও বাস্তবতা বিবেচনার আহ্বান
ফিকির সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী বলেন, করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্যকর করহার কমানো প্রয়োজন। তিনি কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলে ধরে বলেন, এসব কারণে অনেক খাতে এখন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
শিল্প খাতের জন্য বিশেষ প্রস্তাব
শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং শিল্পখাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে মনে করে ফিকি।
একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের পার্থক্য (বর্তমানে প্রায় ৭.৫ শতাংশ) কমানোর আহ্বান জানানো হয়। তবে এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান ইঙ্গিত দেন, এই ব্যবধান আরও বাড়ানো হতে পারে।
বিভিন্ন খাতে বাধ্যতামূলক কর রিটার্নের প্রস্তাব
ফিকির সহসভাপতি এবং লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বিভিন্ন সেবায় আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন। যেমন—গাড়ির লাইসেন্স নবায়ন বা মূসক রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন সংযুক্ত করা।
তিনি দাবি করেন, ফিকির সদস্যরা দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখে, যা বিনিয়োগবান্ধব নীতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
বহুজাতিক কোম্পানির উদ্বেগ
ফিকির পরিচালক এবং ওরাকল-এর বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান অঞ্চলের কান্ট্রি ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে করের বাড়তি চাপ তৈরি হলে তা বিনিয়োগে দ্বিতীয় ধাক্কা হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আরও জানান, দেশে একটি ডেটাবেজ তৈরি করতে প্রায় ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়, যা ডিজিটাল খাতের উন্নয়নে বড় বাধা।
টেলিকম খাতের দাবি
মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা পিএলসি-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াদ সাতারা সিমকার্ড পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন সিমের মতো কর আরোপ না করার প্রস্তাব দেন। তার মতে, এটি গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করে।
বিনিয়োগবান্ধব নীতির প্রয়োজনীয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে কর কাঠামো সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করা জরুরি। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে করহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


