Wednesday, September 23

দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি সুবিধা চেয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ব্যাংকগুলোর প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) ও প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তারা (সিবিও) এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ।

সম্প্রতি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিল্পখাতে স্থবিরতা কাটাতে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয় সরকার। এই ঘোষণার বাস্তবায়নে একটি বিশেষ তহবিল গঠন এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই লক্ষ্যে অংশীজনদের মতামত নিতে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়, যেখানে ব্যাংকাররা তাদের অভিজ্ঞতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় শর্ত তুলে ধরেন।

ব্যাংকারদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো—বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনে দেওয়া ঋণের বিপরীতে একটি নির্ভরযোগ্য গ্যারান্টি ব্যবস্থা থাকা। তাদের মতে, অতীতে প্রদত্ত ঋণের একটি বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় নতুন করে ঝুঁকি নিতে ব্যাংকগুলো অনাগ্রহী। তাই ঋণ পুনরায় খেলাপি হলে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

এ ছাড়া নতুন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জামানতের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন ব্যাংকাররা। তারা আরও প্রস্তাব করেন, অর্থায়নকৃত কারখানাগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরামর্শক বা মনিটরিং টিম নিয়োগের সুযোগ রাখা উচিত, যাতে ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়।

বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, যেসব উদ্যোক্তা অর্থ পাচার করে বিদেশে পলাতক হয়েছেন, তারা এই তহবিলের আওতায় কোনো সুবিধা পাবেন না। শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত উদ্যোক্তারাই এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, প্রস্তাবিত নীতিমালায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হবে। সম্প্রতি বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো স্বল্পমেয়াদি ঋণ সুবিধা পাবে, দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন কারখানার জন্য থাকবে মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন, আর দীর্ঘদিন বন্ধ ও যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য থাকবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুযোগ। এ উদ্দেশ্যে একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা সরকারি সহায়তায় বাস্তবায়িত হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, খুব শিগগিরই এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও তহবিল ঘোষণা করা হবে। এ জন্য ব্যাংকগুলোর কাছে আগামী সোমবারের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।

ব্যাংকাররা বৈঠকে উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে নীতি-সহায়তার আওতায় প্রায় ৩০০ শিল্পগোষ্ঠীর এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করেন। তবে বন্ধ কারখানায় নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলা চলমান রয়েছে।

বৈঠকে অতীত অভিজ্ঞতার কথাও উঠে আসে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ঘোষিত ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বিতরণ করা বিপুল অঙ্কের ঋণের একটি বড় অংশ বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে বলে ব্যাংকাররা জানান। ফলে নতুন করে ঝুঁকি নিতে ব্যাংকগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে সরকার শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও দায়িত্ব গ্রহণের পর একই ধরনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version