Wednesday, September 23

ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে জাল নথি ও ভুয়া বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ; বিপাকে ৪০ লাখের বেশি বিমা গ্রাহক

দেশের আর্থিক খাতে আলোচিত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত প্রক্রিয়া। প্রায় ৬৪৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)সহ মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

তদন্ত কর্মকর্তা শাহ মিনহাজ উদ্দিনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বৃহস্পতিবার আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন। এতে সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম এবং সাবেক সিইও মো. হেমায়েত উল্যাহসহ কোম্পানির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য ও কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মামলার পটভূমি

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় এ মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে, পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের বাইরে গিয়ে ভুয়া চিঠি, জাল ভাউচার ও ভুয়া বিনিয়োগ দেখিয়ে কোম্পানির বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্থিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এই অনিয়মের কারণে প্রায় ৪০ লাখ বিমা গ্রাহক এবং কয়েক হাজার কর্মকর্তা–কর্মচারী চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।

অভিযুক্তদের তালিকা

অভিযোগপত্রে প্রধান অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী তাসলিমা ইসলাম, স্ত্রীর ভাই সেলিম মাহমুদ এবং নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার সহোদর মো. সোহেল খান ও মো. আজাহার খান।

এছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান এম এ খালেক, তাঁর স্ত্রী সাবিহা খালেক এবং তাঁদের সন্তান শাহরিয়ার খালেদ, রুবাইয়াত খালেদ ও শারওয়াত খালেদকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। তবে এম এ খালেক গত বছরের নভেম্বরে কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান।

অভিযোগপত্রে সাবেক সিইও মো. হেমায়েত উল্যাহ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের সাবেক সিইও একরামুল আমিন ও মো. আলী হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) মো. জাহাঙ্গীর আলম মুন্সী, অর্থ ও হিসাব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান খান, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. কামাল হোসেন হাওলাদারসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা মামলার আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

কীভাবে আত্মসাৎ করা হয় অর্থ

পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ব্যাংকে বিনিয়োগ করা অর্থ নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সরিয়ে নেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কৌশলে কোম্পানির মোট ৬৪৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর ৩৬ তোপখানা রোডে একটি ভবন ও জমি ক্রয়ের নামে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা এবং ৭২ কাকরাইল এলাকায় ভবন ও জমি ক্রয়ের নামে প্রায় ১১৫ কোটি টাকা নেওয়া হয়।

এছাড়া রাজধানীর মিরপুরের গোড়ান চটবাড়ী এলাকায় জমির উন্নয়ন ব্যয়ের অজুহাতে প্রায় ৯২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব লেনদেনের মাধ্যমে কোম্পানির অর্থ ধাপে ধাপে ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের কাছে স্থানান্তর করা হয়।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি

অভিযুক্তদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ম্যাকসনস মিথিলা টেক্সটাইল, মিথিলা প্রোপার্টিজ, পিএফআই প্রোপার্টিজ, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, পিএফআই সিকিউরিটিজ, প্রাইমএশিয়া ফাউন্ডেশন, আজাদ অটোমোবাইলস, মোল্লা এন্টারপ্রাইজ, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ, প্রাইম ফাইন্যান্সিয়াল সিকিউরিটিজ, ম্যাকসনস অ্যাসোসিয়েটস এবং প্রাইম প্রোপার্টি হোল্ডিংস লিমিটেড।

বিদেশে সম্পদ কেনার অভিযোগ

তদন্তে আরও জানা গেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে একটি বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন। ওয়েলিংটন এলাকার ওই বাড়িটি ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩২৭ মার্কিন ডলার দিয়ে কেনা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাড়িটি কেনার ক্ষেত্রে কোনো ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়নি, পুরো অর্থ এককালীন পরিশোধ করা হয়েছিল।

এছাড়া তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে যুক্তরাষ্ট্রের একই অঙ্গরাজ্যে আরও কয়েকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ করণীয়

বর্তমানে সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ও সাবেক সিইও মো. হেমায়েত উল্যাহ কারাগারে রয়েছেন। তবে তদন্তকালে দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম বলেন, অতীতে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ কোম্পানির হারানো আস্থা ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু বিচার হোক এবং গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করা হোক।”

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিমা খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি জোরদার করাও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version