Wednesday, September 23

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমদানির খরচ কমানোর লক্ষ্যে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানিতে বিদ্যমান সর্বোচ্চ ডলার সীমা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক চাল, ডাল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাল্ক বা বড় চালানে আমদানির সুবিধার্থে সেলস কন্ট্রাক্টে আরোপিত সীমা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে।

বর্তমানে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে সমুদ্রপথে বড় চালানে পণ্য আনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাধারণত নিত্যপণ্যের একটি চালানের মূল্য ২০ থেকে ২৫ লাখ ডলারের মধ্যে হয়, যা বর্তমান সীমার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী নেতাদের অভিমত—এই সীমা তুলে দেওয়া হলে বাজারে দ্রুত পণ্য সরবরাহ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির সুযোগ কমবে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে দামের ওপর।

বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এখনো প্রধানত ঋণপত্র বা এলসি ব্যবহৃত হয়। এলসির ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতা থাকে এবং ব্যাংক গ্যারান্টরের ভূমিকা পালন করে। এতে পণ্যের মান ও অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা থাকলেও পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

অন্যদিকে সেলস কন্ট্রাক্ট হলো রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকের মধ্যে সরাসরি চুক্তি, যেখানে ব্যাংক গ্যারান্টর হিসেবে যুক্ত থাকে না। ফলে এতে আমদানির সময় ও ব্যয়—দুটিই তুলনামূলকভাবে কম হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর) এলসির মাধ্যমে ৬০ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানি হয়েছে ৭ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির মাত্র ১২ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকেই এই সীমা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল।

তিনি বলেন, “গভর্নরের অবস্থান স্পষ্ট—সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানি দ্রুত হয়, যা বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক। তবে এখনো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।”

কয়েক মাস স্থিতিশীল থাকার পর সম্প্রতি নিত্যপণ্যের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে কার্গো খালাসে বিলম্বকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বাজার তদারকির দুর্বলতার কথা বলছে।

গত এক সপ্তাহে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা ও ডালের মতো রমজানের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে, যা খুচরা বাজারে আরও মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এই ধরনের আমদানি বিধিনিষেধ অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানি সহজ হলে বাজার শক্তিশালী হয় এবং মজুতদারি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নিত্যপণ্য আমদানিতে সেলস কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে। ইউরোপের অনেক দেশে এলসির ওপর নির্ভরতা কম, ফলে পণ্য দ্রুত বাজারে আসে এবং জটিলতাও কমে।”

ব্যাংকারদের মতে, এলসির মাধ্যমে আমদানিতে কমিশন, কনফার্মিং চার্জসহ নানা খরচ যুক্ত হয়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০ লাখ ডলারের একটি এলসিতে শুধু কমিশন ও কনফার্মিং চার্জেই প্রায় ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

অন্যদিকে সেলস কন্ট্রাক্টে আমদানিতে কেবল একটি ওপেনিং চার্জ দিতে হয়, যার পরিমাণ গড়ে প্রায় ১০০ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা জানান, অনেক বিদেশি রপ্তানিকারক এখন এলসির পরিবর্তে সেলস কন্ট্রাক্টে পণ্য পাঠাতে আগ্রহী। কিন্তু বিদ্যমান বিধিনিষেধের কারণে দেশের আমদানিকারকরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না।

তিনি বলেন, “সেলস কন্ট্রাক্ট উন্মুক্ত করা হলে খাতুনগঞ্জের ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় শিল্পগোষ্ঠী—সবাই উপকৃত হবে।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ রপ্তানি ইতোমধ্যে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের নমনীয়তা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানির শর্ত সহজ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিক অনুমোদন চেয়েছে।

তিনি বলেন, “সেলস কন্ট্রাক্টে আমদানি করলে খরচ কম হবে এবং বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে একই সঙ্গে অর্থ পাচার রোধে নজরদারি জোরদার রাখার বিষয়েও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।”

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “কৃত্রিম সংকট ও মূল্য কারসাজি ঠেকাতে দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবসায়ীরা যদি জানেন, দাম বাড়ালেই দ্রুত আমদানি আসবে, তাহলে বাজারে কারসাজির প্রবণতা কমে যাবে।”

ব্যবসায়ী নেতারাও একই মত প্রকাশ করেছেন। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এলসির অতিরিক্ত চার্জের কারণে একবার তার প্রায় ৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল, যা সেলস কন্ট্রাক্টে হলে এড়ানো সম্ভব হতো।

মেঘনা গ্রুপের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, সেলস কন্ট্রাক্টের সুযোগ বাড়ানো হলে আমদানি ব্যয় কমবে এবং এর সুফল সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, সেলস কন্ট্রাক্টের সীমা তুলে দিলে আমদানিকারকরা প্রয়োজনীয় নমনীয়তা পাবেন, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version