দেশের আর্থিক খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি খাতকেও সরব হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনতে ব্যবসায়ী ও করপোরেট খাতেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘পোস্ট-আপরাইজিং ইকোনমি অ্যান্ড জিওপলিটিকস অব বাজেট: রেমিনিসিং দ্য লেগ্যাসি অব এম সাইফুর রহমান’ শীর্ষক নীতি সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “বেসরকারি খাত নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকতে পারে না। দেশের অর্থনীতি কোথায় ভুল পথে গেছে, কোন কোন জায়গায় সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং কেন হয়েছে—এসব বিষয় নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজকেও খোলামেলা কথা বলতে হবে। অর্থনীতিকে সঠিক পথে নিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”
খেলাপি ঋণ নিয়ে ব্যাংকমালিকদের মানসিকতায় ক্ষোভ
অনুষ্ঠানে দেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী একটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৬ শতাংশে পৌঁছানোর পরও মালিকপক্ষ সেটিকে “অগ্রগতি” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “একটি ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকা সহায়তা ছাড়া টিকতে পারবে না—এমন পরিস্থিতির কথা আমাকে বলা হয়েছে। পরে সেই ব্যাংকের এক মালিক গর্ব করে বললেন, তারা খেলাপি ঋণ ৯৬ শতাংশ থেকে ৫৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন। ভাবুন, মানসিকতার অবস্থা কোথায় পৌঁছেছে।”
তিনি আরও বলেন, দেশের ভেতরে ও বিদেশে অনেক ব্যাংকমালিকের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এখন আর গোপন কিছু নয়। অথচ একই সময়ে দেশের সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীরা আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
দুর্বল নিরীক্ষা ও আর্থিক প্রতিবেদনেই বেড়েছে লুটপাট
ব্যাংক খাত থেকে অর্থ পাচার ও লুটপাটের পেছনে দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন এবং অকার্যকর নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে বড় কারণ হিসেবে দায়ী করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, দেশের আর্থিক প্রতিবেদনের মান এখন অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। প্রকৃত আর্থিক চিত্র সঠিকভাবে প্রকাশ না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম আড়ালে থেকে গেছে।
তিনি বলেন, “যথাযথ আর্থিক প্রতিবেদন না থাকলে হিসাবের প্রকৃত অবস্থা কখনোই প্রকাশ পায় না। ব্যাংক থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে, তার পেছনে এই দুর্বল রিপোর্টিং ব্যবস্থারও দায় রয়েছে।”
ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে বড় সংস্কারের আভাস
দেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যেই পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হবে। সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে পেশাদার ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা International Finance Corporation (আইএফসি) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংককে সম্পৃক্ত করে দেশের ব্যাংকিং খাতকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট মোকাবিলা সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ’ হবে আগামী বাজেটের মূল বার্তা
আগামী বাজেটে গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অর্থনীতির সুফল যেন কেবল একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য “অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ” ধারণাকে সামনে আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “কোনো গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সবাইকে সম্পৃক্ত করেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।”
নিত্যপণ্যে কৌশলগত মজুত গড়বে সরকার
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ বা কৌশলগত মজুত গড়ে তুলবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের মতো বড় জনসংখ্যার দেশে এখনো কার্যকর কৌশলগত মজুত ব্যবস্থা নেই। মাত্র দুই-তিন সপ্তাহ সরবরাহ ব্যাহত হলেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।”
তিনি জানান, সরকার এমন একটি মজুতব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যার মাধ্যমে জরুরি সময়ে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে এবং কৃত্রিম সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, পণ্য আমদানির চুক্তি, এলসি খোলা, শিপমেন্ট থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইন একটি ডিজিটাল এআই মডেলের আওতায় আনা হবে।
এর ফলে বাজারে পণ্যের গতিবিধি, মজুত পরিস্থিতি ও সরবরাহের প্রকৃত চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়ে বাড়ছে পণ্যের দাম
দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে লজিস্টিক ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১০ শতাংশের কাছাকাছি।
কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। উদাহরণ দিয়ে বলেন, যশোরের কৃষক যে সবজি ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করেন, সেটি ঢাকায় এসে ৫০ থেকে ৬০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান কমাতে সরকার অনুসন্ধানী কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
১৭ বছরের অব্যবস্থাপনার দায়ে জ্বালানি খাত সংকটে
একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার ফল এখন পুরো জাতিকে ভোগ করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স-কে আরও শক্তিশালী করতে নতুন রিগ কেনা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
‘বাড়ি বাড়ি গ্যাস দেওয়া ছিল নীতিগত ভুল’
আবাসিক খাতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের পুরোনো নীতির সমালোচনা করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, অতীতে গ্যাসকে অশেষ সম্পদ মনে করে অপচয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সেই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কারণে সরকার এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতেই বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে এই খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার দায় সামাল দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জুনেই আসছে নতুন সৌরবিদ্যুৎ নীতি
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী জুনের মধ্যে নতুন সৌরবিদ্যুৎ নীতি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত কর বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। তাই কর কাঠামো সহজ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য চলতি মেয়াদের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করা বলেও জানান তিনি।


