Wednesday, September 23

বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সম্প্রসারণ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, দেশে পরিচালিত জাপানি প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশি—প্রায় ৫৭ শতাংশ—আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তাদের ব্যবসা বিস্তারের পরিকল্পনা করছে। মূলত স্থানীয় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা শ্রেণির কারণে এই আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তবে আশাব্যঞ্জক এই প্রবণতার পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যবসা পরিবেশ নিয়ে জাপানি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগও কম নয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে তারা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে কর-ব্যবস্থার জটিলতা, নীতিমালার অস্পষ্টতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধীরগতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেট্রো জরিপে যা উঠে এসেছে

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) পরিচালিত জরিপে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কার্যক্রম চালানো জাপানি কোম্পানিগুলোর মতামত নেওয়া হয়। বাংলাদেশে কার্যরত ৫৯টি জাপানি ও যৌথ উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। জরিপে দেখা যায়, শুধু বাংলাদেশ নয়—পুরো অঞ্চলে জাপানি ব্যবসাগুলো ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং লাভজনক হওয়ার প্রত্যাশা বাড়ছে।

চীন, ভারতসহ বড় অর্থনীতিগুলোতে স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদন দক্ষতা উন্নয়ন এবং খরচ নিয়ন্ত্রণের ফলে জাপানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে, কারণ অনেক কোম্পানি বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনায় রাখছে।

স্থানীয় বাজার: বড় আকর্ষণ

বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রধান কারণ হিসেবে ৬৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা উল্লেখ করেছে। একসময় যেখানে জাপানি পণ্য আমদানিনির্ভর ছিল, এখন সেখানে অনেক কোম্পানি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু করেছে বা যৌথ উদ্যোগে কারখানা স্থাপন করছে।

এছাড়া রপ্তানি সম্ভাবনা, প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান, উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার তৈরি এবং দক্ষ জনশক্তির প্রাপ্যতাও বিনিয়োগ বাড়ানোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D)-এ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহ তুলনামূলক কম।

ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ: বিনিয়োগে বড় বাধা

জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচটি ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা—যা ৯৪ শতাংশ কোম্পানি উল্লেখ করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে।

এর পাশাপাশি—

  • কর ব্যবস্থার জটিলতা ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া
  • নীতিমালার অস্পষ্টতা
  • লাইসেন্স ও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা
  • আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা

এসব বিষয় ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।

প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে সস্তা শ্রম ও বিশাল বাজার সম্ভাবনা। জরিপে ৭৭ শতাংশ কোম্পানি সস্তা শ্রমকে এবং ৫৬ শতাংশ বাজার সম্ভাবনাকে প্রধান সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া সহজে কর্মী পাওয়া, ভাষাগত সুবিধা এবং স্থানীয় দক্ষ জনশক্তিও ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তবে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নত ব্যবসা পরিবেশের কারণে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মুনাফা বাড়ার আশা

জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৪৫ শতাংশ জাপানি কোম্পানি আশা করছে, ২০২৬ সালে তাদের মুনাফা বাড়বে। একই হারে প্রতিষ্ঠান মনে করছে মুনাফা স্থিতিশীল থাকবে, আর প্রায় ১০ শতাংশ কোম্পানি মুনাফা কমার আশঙ্কা করছে। আগের বছরের তুলনায় মুনাফার প্রত্যাশা বেড়েছে, যা ব্যবসা পরিবেশের আংশিক উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।

করণীয়: নীতিগত সংস্কার জরুরি

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপানের মতো বড় অর্থনৈতিক অংশীদারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত নীতিগত সংস্কার করতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আগ্রহ থাকলেই বিনিয়োগ আসে না—বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আস্থা ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত কাঠামো। তাই জাপানি কোম্পানিগুলোর উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version