দেশের কৃষি খাত ও সামাজিক উন্নয়নকে নতুন গতি দিতে নিজস্ব তহবিল থেকে ৫৩ কোটি টাকার একটি সমন্বিত বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে BRAC। আগামী তিন মাসে এই কর্মসূচির আওতায় সারা দেশের ১ লাখ ৩ হাজার কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ, কৃষি উপকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সড়ক নিরাপত্তা, অভিবাসন, সামাজিক ক্ষমতায়ন, আইনি সহায়তা এবং শিক্ষা খাতেও নেওয়া হয়েছে বহুমাত্রিক উদ্যোগ।
মূল্যস্ফীতির চাপে কৃষকের পাশে উদ্যোগ
বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও কৃষি উপকরণের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা চাপে রয়েছেন। এই বাস্তবতায় ব্র্যাকের এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে। কর্মসূচির আওতায় কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা সরাসরি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যয় করা হবে।
জীবিকায় সহায়তা ও সম্পদ বিতরণ
কৃষকদের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে মাইক্রোফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে—
- ৫০ লাখ মাছের পোনা
- ১ লাখ হাঁসের ছানা
- ১ লাখ মুরগির বাচ্চা
- ১ লাখ গাছের চারা
এছাড়া ২০ হাজার গবাদিপশুকে দেওয়া হবে বিনামূল্যে টিকাদান সেবা, যা পশুসম্পদ খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশবান্ধব কৃষিতে জোর
রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় এক হাজার ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে ৫০টি আলু ও ৫০টি পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার, যা ফসল সংরক্ষণে সহায়তা করবে এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তি
কৃষিকাজকে সহজ ও সাশ্রয়ী করতে বিতরণ করা হবে ২০টি মাড়াই যন্ত্র এবং ১০০টি পাওয়ার টিলার। এছাড়া পাঁচ হাজার পানিসাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তি সরবরাহ করা হবে, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পানি সাশ্রয় করতে সক্ষম। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং ফলন বাড়বে—যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ
কৃষকদের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- জমির উর্বরতা সংরক্ষণ
- কম খরচে কীটনাশক ব্যবহার
- গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (GAP)
- জৈব বালাইনাশক প্রয়োগ
- উন্নত জাতের ধান উৎপাদন
নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষায় সহায়তা
নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘স্বপ্নসারথি’ উদ্যোগের মাধ্যমে ৭ হাজার ৮১০ জন গ্রামীণ তরুণীকে হাঁস-মুরগি পালন, সেলাই ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর ফলে তারা আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন। পাশাপাশি ৫ হাজার ২৪০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সহায়তা দেওয়া হবে এবং হাওর অঞ্চলের চারটি স্কুলে আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা হবে।
সমন্বিত উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টি
ব্র্যাকের কর্মকর্তারা জানান, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, বরং কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ভাসমান সবজি চাষ, মাশরুম উৎপাদন, মৌমাছি পালন, মধু বিপণনসহ বিভিন্ন উদ্ভাবনী কৃষি কার্যক্রমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।


