Wednesday, September 23

দেশের কৃষি খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক সম্ভাবনার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৫ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ‘আউটলুক ২০৫০’ শীর্ষক এই পরিকল্পনায় কৃষিপণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২১ লাখ কোটি টাকা সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়েছে।

বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত ট্রান্সফরমিং বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। কৃষিসচিব মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ঢাকাস্থ প্রতিনিধি জিয়াকুন শি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেনমো. মুস্তাফিজুর রহমান

সেমিনারে খসড়া মহাপরিকল্পনার মূল দিকগুলো তুলে ধরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহমুদুর রহমান জানান, কৃষি খাতের উন্নয়নে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনার প্রথম ধাপে প্রায় লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে প্রায় ১৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২১ লাখ কোটি টাকা, যা মূলত উন্নয়ন বাজেট থেকেই আসবে।

তিনি বলেন, এই বিনিয়োগ বীজ, সার, সেচব্যবস্থা, কীটনাশক এবং কৃষিতে স্মার্ট ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে ব্যয় করা হবে। ১৩টি থিমেটিক খাতের আওতায় ৩৫টি উপখাতকে গুরুত্ব দিয়ে এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষিতে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, কৃষিপ্রযুক্তি উন্নয়ন, কৃষিশিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সেমিনারে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রসঙ্গে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার কৃষিযন্ত্রের বাজার গড়ে উঠেছে, যার প্রায় ৭২ শতাংশই আমদানিনির্ভর। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কৃষিযন্ত্র উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভবিষ্যতে প্রায় ২৩৮টি নতুন বীজের জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজন হবে বলেও জানানো হয়। পাশাপাশি ৩৫টি শস্যের জন্য ২৪৫টি স্থানীয় কীটনাশক এবং ১২৩টি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। সেচ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বলা হয়, বর্তমানে কৃষি খাতে প্রায় ৭২ শতাংশ সেচের পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সারের ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে সেমিনারে সারের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “কৃষকের উন্নতি ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বড় শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে অনেক সময় সুদ মওকুফ করা হলেও কৃষকেরা প্রয়োজনীয় প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হন। শুধু আমদানিনির্ভর হলে চলবে না, নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।”

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য মনজুর হোসেন বলেন, ভবিষ্যতে দেশে বাণিজ্যিক কৃষি ও চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের পরিসর আরও বাড়বে। এতে ছোট খামারগুলোর টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সভাপতির বক্তব্যে কৃষিসচিব মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, এই মহাপরিকল্পনা দেশের কৃষি খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে। দেশের সব অঞ্চল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে। সেমিনারে কৃষিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, কৃষি উদ্যোক্তা এবং কৃষক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version