দেশের আমদানি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও বাণিজ্যবান্ধব করতে তিন বছর মেয়াদি নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৫–২০২৭’–এর খসড়া অনুমোদন পেয়েছে উপদেষ্টা পরিষদে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে খসড়াটি নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নতুন নীতির মূল লক্ষ্য হলো আমদানি পণ্য দ্রুত খালাস নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রয়োজন হয় এবং প্রথম পরীক্ষায় বিরূপ ফল আসে, সেসব ক্ষেত্রে আমদানিকারককে দ্বিতীয়বার পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে। এতে অযথা বিলম্ব ও ক্ষতির ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানিমুখী খাতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল সুবিধা
রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে শতভাগ রপ্তানিমুখী কয়েকটি শিল্পখাতে বিনা শুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, জাহাজ নির্মাণ, ফার্নিচার ও ফার্নিসিং শিল্প—এসব খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও কাঁচামাল শুল্ক ছাড়াই আমদানি করতে পারবে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইলেকট্রনিক শুল্কায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন নীতিতে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শুল্কায়ন ও শুল্ককর আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং খালাসোত্তর নিরীক্ষা (Post Clearance Audit)–এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সময় সাশ্রয় হবে।
নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় ২৭ ক্যাটাগরি
নতুন নীতিমালার খসড়ায় পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে ২৭ ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- জীবিত শূকর ও শূকরজাত পণ্য
- পপি সিড ও পোস্তদানা
- কৃত্রিম সরিষার তেল ও নিম্নমানের বা ব্যবহৃত রিকন্ডিশন্ড পণ্য
- পুরোনো অফিস সরঞ্জাম যেমন ফটোকপিয়ার, টাইপরাইটার, টেলেক্স, পুরোনো কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী
- শিল্প স্লাজ ও বর্জ্যজাত পণ্য
এছাড়া স্টকহোম কনভেনশন অন পারসিসট্যান্ট অর্গানিক পলিউট্যান্টস (পিওপি)–এর আওতাভুক্ত বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক যেমন ডিডিটি, অ্যালড্রিন, ক্লোরডেন, হেপ্টাক্লোর, মিরেক্স, টক্সাফিনসহ একাধিক কীটনাশক ও শিল্প রাসায়নিক আমদানি নিষিদ্ধ থাকবে।
পরিবেশ দূষণ ও শব্দ দূষণ রোধে ৭৫ ডেসিবেলের বেশি মাত্রার হর্ন, পলিথিন ও পলিপ্রপিলিন ব্যাগ, দুই–স্ট্রোক ইঞ্জিনচালিত থ্রি–হুইলার যানবাহনও নিষিদ্ধ তালিকায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সীমারেখা সঠিকভাবে প্রদর্শিত হয়নি এমন মানচিত্র, অশ্লীল বা নাশকতামূলক সাহিত্য, পোস্টার ও অডিও–ভিডিও সামগ্রী আমদানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
শর্তসাপেক্ষ আমদানি
কিছু পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না হলেও শর্তপূরণ সাপেক্ষে আমদানি করা যাবে। যেমন—
- ফার্নেস অয়েল
- নির্দিষ্ট মাপের কম ব্যাসের কারেন্ট জাল
- পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি
- তিন বছরের বেশি পুরোনো এবং ১৬৫ সিসির ঊর্ধ্বে মোটরসাইকেল
- নির্দিষ্ট ধরনের গ্যাসীয় হাইড্রোকার্বন ও পেট্রোলিয়ামজাত অবশিষ্ট তেল
এয়ারগান, এয়াররাইফেল ও এয়ার পিস্তল সাধারণভাবে আমদানি নিষিদ্ধ থাকলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এসব সরঞ্জাম আনতে পারবে।
দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির ইঙ্গিত
বৈঠক–পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন আমদানি নীতি আদেশকে সময়োপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত যাচাই শেষে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। প্রজ্ঞাপন কার্যকর হলে বর্তমান নীতিমালা বাতিল হয়ে নতুন আদেশই বহাল থাকবে।
সামগ্রিকভাবে নতুন আমদানি নীতি আদেশ কার্যকর হলে দেশের আমদানি–রপ্তানি ব্যবস্থায় গতি আসবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং শিল্পখাতের উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।


