Wednesday, September 23

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যসেবা ও বিমা সুবিধা একসঙ্গে নিয়ে এসেছে একটি বিশেষ ‘হেলথ কার্ড’। বছরে মাত্র ৬০০ টাকা খরচে এই কার্ডধারীরা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিমা সুবিধাসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন, যা দেশের ক্রমবর্ধমান বাইকার সম্প্রদায়ের জন্য একটি নতুন আর্থিক সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাপানি মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড ইয়ামাহার বাংলাদেশে অফিশিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর এসিআই মোটরস এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পালস হেলথকেয়ার লিমিটেড যৌথভাবে গত বছরের নভেম্বরে ‘বাইকার্স কেয়ার’ নামে এই স্বাস্থ্য কার্ড চালু করে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চালুর মাত্র চার মাসের মধ্যেই আট হাজারের বেশি মোটরসাইকেল চালক এই কার্ড গ্রহণ করেছেন।

কার্ডে মিলছে স্বাস্থ্যসেবা ও বিমা সুবিধা

এই হেলথ কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহক এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশব্যাপী প্রায় ১ হাজার ৮০০-এর বেশি চিকিৎসক এবং শতাধিক নেটওয়ার্ক হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত এই সেবায় বিভিন্ন চিকিৎসা পরীক্ষায় ও হাসপাতালে চিকিৎসায় মূল্যছাড়ও পাওয়া যাচ্ছে।

কার্ডটির অন্যতম বড় সুবিধা হলো দুর্ঘটনা-পরবর্তী আর্থিক সহায়তা। দুর্ঘটনায় কার্ডধারীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জীবনবিমা সুবিধা পাবে। অন্যদিকে দুর্ঘটনার বাইরে অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হলে পরিবারকে এক লাখ টাকা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে বছরে চারবার পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ব্যয় সহায়তা দেওয়া হবে। যদি আঘাত গুরুতর না হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন না পড়ে, তাহলে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়া যাবে।

অতিরিক্ত সেবাও পাচ্ছেন গ্রাহকরা

হেলথ কার্ডধারীদের জন্য আরও কিছু সহায়ক সেবাও যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্ঘটনার পর থেরাপি ও মানসিক সহায়তা, বাসায় ওষুধ সরবরাহ, অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগের সহায়তা।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা ইয়ামাহার প্রায় ১২০টি বিক্রয়কেন্দ্র থেকে এই হেলথ কার্ড নেওয়া যাচ্ছে। কার্ড নিতে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ কিছু মৌলিক তথ্য প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি একজন নমিনির নাম, মোবাইল নম্বর ও পরিচয়পত্রের তথ্যও জমা দিতে হয়।

দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৪৮ লাখ ৭১ হাজারই মোটরসাইকেল, যা মোট যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ।

যানবাহনের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনাও বাড়ছে। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট।

এই প্রেক্ষাপটে বাইকারদের জন্য স্বাস্থ্য ও আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা

হেলথ কার্ডের একজন গ্রাহক মো. রাহাদ উল ইসলাম পেশায় একজন ফ্রিল্যান্সার। তিনি বলেন, সেবা চালুর পরপরই তিনি ৬০০ টাকা দিয়ে কার্ডটি নেন। কিছুদিন পর তিনি একটি দুর্ঘটনার শিকার হন এবং সেই সময় চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য এই কার্ড থেকে সহায়তা পেয়েছেন।

তার ভাষায়, “বছরে মাত্র ৬০০ টাকা—দিনে এক কাপ চায়ের দামের থেকেও কম। কিন্তু প্রয়োজনের সময় এই সুবিধা অনেক কাজে লাগে।”

ভবিষ্যতে আরও বড় প্যাকেজের পরিকল্পনা

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ বাইকার মূলত দুই ধরনের বিমা সুবিধা গ্রহণ করেন—মোটরসাইকেল চুরি হলে ক্ষতিপূরণ এবং দুর্ঘটনায় তৃতীয় পক্ষের ক্ষতির জন্য বিমা। কিন্তু চালকের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বা আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বিমা করার প্রবণতা এখনও খুব কম।

এই বাস্তবতায় হেলথ কার্ডটি স্বাস্থ্যসেবা ও বিমা সুবিধাকে একসঙ্গে নিয়ে এসেছে।

এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই সুবিধা শুধু ইয়ামাহা ব্যবহারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সব মোটরসাইকেল চালকের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, “এটি মূলত বাইকারদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য করা উদ্যোগ। এখানে মুনাফার বিষয়টি বড় নয়। আমরা চাই, দেশের সব বাইকার যেন এই ধরনের সুরক্ষা সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।”

তিনি আরও জানান, শিগগিরই আরও বড় সুবিধা ও বেশি বিমা কভারেজসহ নতুন একটি প্যাকেজ চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে। এতে গ্রাহকদের কিছুটা বেশি অর্থ দিতে হলেও তারা আরও বিস্তৃত সুবিধা পাবেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version