Wednesday, September 23

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করায় দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে বেশি ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকগুলো বলছে, এই সীমা কার্যকর হলে তাদের পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে এবং এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, এসএমই ঋণ পরিচালনা অন্যান্য করপোরেট ঋণের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। কারণ ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো, ঋণ যাচাই, মাঠপর্যায়ের তদারকি, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ে অতিরিক্ত জনবল ও অবকাঠামোগত ব্যয় প্রয়োজন হয়। ফলে মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেডের মধ্যে এই খাতের ঋণ পরিচালনা আর্থিকভাবে টেকসই নাও হতে পারে।

এসএমই খাতে নতুন ঋণ বিতরণে ধীরগতি আসতে পারে

ব্যাংকাররা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, নতুন নীতিমালার কারণে অনেক ব্যাংক বাধ্য হয়ে এসএমই খাতে নতুন ঋণ অনুমোদন কমিয়ে দিতে পারে। এতে নতুন উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনতে যেখানে এসএমই খাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেখানে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এসএমই ঋণকে ৪ শতাংশ স্প্রেড সীমার বাইরে রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবও দিতে পারে।

নতুন নির্দেশনা কার্যকর, তবে প্রস্তুতির সময় পেল না ব্যাংক

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানায়, ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের গড় সুদহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। তবে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ এই নির্দেশনার বাইরে থাকবে। প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। তবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, সুদের হার নির্ধারণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যা সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা কমিটির (এএলকো) অনুমোদনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে নতুন হার নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়।

সুদের ব্যবধান কমানো ইতিবাচক, তবে বাড়বে ব্যাংকের চাপ

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সুদের ব্যবধান কমানোর ফলে ব্যবসা পরিচালনার অর্থায়ন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারবেন। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর লাভজনকতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক উচ্চ পরিচালন ব্যয়ে এসএমই খাতে কাজ করছে, তাদের জন্য নতুন নিয়ম বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কথা বলছে এসএমই ঋণদাতা ব্যাংকগুলো

দেশের অন্যতম বৃহৎ এসএমই ঋণদাতা ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ব্যাংকটির মোট পরিচালন ব্যয় ও আয়ের অনুপাত যেখানে প্রায় ৪৫ শতাংশ, সেখানে শুধুমাত্র সিএমএসএমই খাতে এই হার প্রায় ৬৫ শতাংশ। কারণ এই খাতে বিপুলসংখ্যক মাঠকর্মী, নিয়মিত গ্রাহক পরিদর্শন এবং নিবিড় তদারকি প্রয়োজন হয়। তার মতে, ৪ শতাংশ স্প্রেডের মধ্যে এই খাত পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসএমই খাতে ঋণ সম্প্রসারণের বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিদ্যমান সুদহার ও নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর গড় আমানত সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং গড় ঋণ সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ গড় স্প্রেড ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা নতুন নির্ধারিত সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অনেক বেসরকারি ব্যাংক বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ বিতরণ করছে। নতুন নির্দেশনা কার্যকর করতে হলে এসব ব্যাংককে ঋণের সুদহার কমানো অথবা আমানতের সুদহার সমন্বয় করতে হবে, যা তাদের মুনাফায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

বহুজাতিক ও বেসরকারি ব্যাংক সবচেয়ে বেশি চাপে

ব্যাংকিং খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর সুদহারের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৯ শতাংশেরও ওপরে। বেসরকারি খাতের কয়েকটি লাভজনক ব্যাংকেও স্প্রেড ৪ শতাংশের বেশি রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোতে স্প্রেড তুলনামূলক কম হলেও সেটিও নতুন নির্ধারিত সীমার ওপরে অবস্থান করছে। ফলে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রায় সব ব্যাংককেই তাদের ঋণ মূল্য নির্ধারণের কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে।

কেন এই সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালুর পর অনেক ব্যাংক আমানতের তুলনায় ঋণের সুদ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর ফলে স্প্রেড অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে ব্যবসা, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থায়নের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনীতিতে এসএমই খাতের গুরুত্ব

বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতে বিতরণ হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৯ সালের মধ্যে এই হার ২৭ শতাংশে উন্নীত করা। শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তা এখনও প্রথাগত ব্যাংকঋণের বাইরে অবস্থান করছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসএমই খাত বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই সুদের ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি এই খাতে ঋণপ্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version