Wednesday, September 23

দেশে কয়েক বছর ধরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ধারাবাহিকভাবে কমে আসলেও ২০২৫ সালে সেই নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বের হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ বৃদ্ধির কারণে এ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। তবে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এখনও আশানুরূপ না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে মোট নিট এফডিআই এসেছে ১৭৭ কোটি ৪ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার।

অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানা পতনের পর এই প্রবৃদ্ধি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে আংশিক আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে যে কারণগুলো কাজ করেছে, তার বড় অংশই এসেছে পুনর্বিনিয়োগ ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কোম্পানিগুলোর ঋণ সহায়তা থেকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত বছর কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের মুনাফার অর্থ নিজ দেশে স্থানান্তর না করে বাংলাদেশেই পুনর্বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে দেশে সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকায় বিদেশি মূল কোম্পানিগুলো তাদের স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি ঋণ দিয়েছে। এই অর্থও বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়েছে। ফলে পরিসংখ্যানে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও নতুন প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগের প্রবাহ এখনও সীমিত।

কয়েক বছরের ধারাবাহিক পতনের পর ইতিবাচক পরিবর্তন

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে নিট এফডিআই ছিল ৩৬১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৯ সালে এফডিআই নেমে আসে ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারে।

এরপর করোনা মহামারির ধাক্কায় বিদেশি বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হয়। ২০২০ সালে এফডিআই কমে দাঁড়ায় ২৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। ২০২১ সালে তা আরও কমে ১৫৭ কোটি ২১ লাখ ডলারে নেমে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এফডিআই ছিল ১৫১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪৬ কোটি ৪১ লাখ ডলারে। ২০২৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগ আরও কমে ১২৭ কোটি ৪ লাখ ডলারে নেমে যায়। সেই ধারাবাহিক পতনের পর ২০২৫ সালে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেল।

২০২৫ সালের চার প্রান্তিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে এফডিআই প্রবাহ ছিল ৭৮ কোটি ৮২ লাখ ডলার। তবে বাকি তিন প্রান্তিকে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ কোটি ডলারের আশপাশেই সীমাবদ্ধ ছিল।

পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণেই বড় প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগের তিনটি প্রধান উপাদান—ইক্যুইটি ক্যাপিটাল, পুনর্বিনিয়োগ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ—সব ক্ষেত্রেই কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে পুনর্বিনিয়োগ খাত থেকে।

২০২৪ সালে পুনর্বিনিয়োগ হিসেবে দেশে এসেছিল ৬২ কোটি ১৯ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে তা প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ কোটি ১৬ লাখ ডলারে।

এ ছাড়া আন্তঃকোম্পানি ঋণ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে এই খাতে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৪৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি কোম্পানিগুলো স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের মূল কোম্পানি থেকে অর্থায়ন নিয়েছে। এর ফলে আন্তঃকোম্পানি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে।

অন্যদিকে, নতুন ইক্যুইটি বা প্রকৃত নতুন বিদেশি বিনিয়োগে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। ২০২৪ সালে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ছিল ৫৪ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে তা সামান্য বেড়ে ৫৫ কোটি ৪৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।

নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ

বিদেশি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশে এফডিআই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান বলেন, নতুন ইক্যুইটি, পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ—তিনটি ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি হওয়া আশাব্যঞ্জক।

তার মতে, গত কয়েক বছরে যেসব বিনিয়োগ প্রস্তাব পাইপলাইনে ছিল, তার কিছু ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। আগামী বছরগুলোতে আরও বড় অংশ বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নিয়ে নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।

তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই)-এর সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী মনে করেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধি প্রকৃত নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরছে না। তার ভাষায়, পুনর্বিনিয়োগ ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নতুন বিদেশি উদ্যোক্তা ও প্রকল্প আকৃষ্ট করা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও সস্তা শ্রমশক্তির সুবিধা পেলেও অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ, লজিস্টিকস ও নীতির ধারাবাহিকতায় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা এবং উন্নত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version